রবিবার, ১০ জুন, ২০১২

বিচারের বাণী কেন আজ কাঁদে?



বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তম
ভগবান, তুমি যুগে যুগে দূত পাঠিয়েছ বারে বারে
দয়াহীন সংসারে—
তারা বলে গেল ‘ক্ষমা করো সবে’, বলে গেল ‘ভালবাসো—
অন্তর হতে বিদ্বেষবিষ নাশো’।
বরণীয় তারা, স্মরণীয় তারা, তবুও বাহির-দ্বারে
আজি দুর্দিনে ফিরানু তাদেরে ব্যর্থ নমস্কারে\
আমি যে দেখেছি গোপন হিংসা কপটরাত্রি-ছায়ে
হেনেছে নিঃসহায়ে।
আমি যে দেখেছি—প্রতিকারহীন, শক্তের অপরাধে
বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে।
আমি যে দেখিনু তরুণ বালক উন্মাদ হয়ে ছুটে
কী যন্ত্রণায় মরেছে পাথরে নিষ্ফল মাথা কুটে\
কণ্ঠ আমার রুদ্ধ আজিকে, বাঁশি সংগীতহারা,
অমাবস্যার কারা
লুপ্ত করেছে আমার ভুবন দুঃস্বপনের তলে।
তাই তো তোমায় শুধাই অশ্রুজলে—
যাহারা তোমায় বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো,
তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ ভালো?
কবিগুরুর অমর ‘প্রশ্ন’ কবিতা আজ সর্বক্ষেত্রে পরিলক্ষিত হচ্ছে। ন্যায়-সত্যের, ত্যাগ-তিতিক্ষার কোনো বালাই নেই। চারিদিকে স্তাবক আর চাটুকারে ছেয়ে গেছে। স্বাধীনতার পর থেকে প্রায় সবাই দেশটাকে লুটেপুটে খেয়েছে, এখনও খাচ্ছে। কিন্তু যে কৃষক কিছুই না পেয়ে জাতীয় জিডিপির ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ অবদান রেখেছে, যে শ্রমিক হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে জাতীয় অর্থনীতিতে ভূমিকা রেখেছে তাদের আজ মহাজোট সরকারের মহামন্ত্রীদের কাছে গালমন্দ শুনতে হচ্ছে। মাননীয় কৃষিমন্ত্রী দক্ষিণ অঞ্চলের কন্যা, এক সময় বঙ্গবন্ধুর পিঠের চামড়া দিয়ে জুতো বানাতেন, শেরপুরে বিয়ে না হলে, আওয়ামী লীগের টিকিট না পেলে সংসদ ভবন চিনতেন কি-না বলা যায় না—তিনি আজকাল বলছেন, কৃষকরা এবং গরিবরা সবচেয়ে বেশি অপচয় করে। সুধী সমাজে মন্ত্রী এ কথা উচ্চারণের আগে তার জিহ্বা আড়ষ্ট হয়ে এল না কেন? আল্লাহর কুদরতে তার কণ্ঠ থেকে জাতির প্রতি এমন অপমানজনক কথা বেরুবার আগে বন্ধ হয়ে গেল না কেন তাই ভাবছি। বড় মর্ম যাতনার শিকার হচ্ছি এসব কথার প্রতিকার করতে না পেরে। গ্রামের দরিদ্র মানুষ কিইবা ব্যয় করে আর তা থেকে কতইবা অপব্যয় করবে! আমাদের দেশের নতুন ধনবানরা এক বেলার খাবারে কেউ কেউ হয়তো লাখ টাকা খরচ করে। তারা কোনো অপব্যয় করে না! অপব্যয় করে সেই গরিব মানুষরা যারা ৬-৭ জনে মিলে একবেলায় একশ’ টাকাও জোগাড় করতে পারে না তারা? এমন চেতনার মহিলা মন্ত্রী দিয়ে আর যাই হোক মানুষের কোনো কল্যাণ হতে পারে না। যে গরিব থালা থেকে মাটিতে ভাত পড়লে খুঁটে খায়, জোট সরকারের কাছে তারা আজ খেতাব পেল অপব্যয়ী। আর যে ধনবানরা একজনের জন্য একশ’ জনের খাবার তৈরি করে প্রতিদিন ডাস্টবিনে ফেলে তারা হচ্ছে মিতব্যয়ী। কী আশ্চর্য ব্যাপার! এসব লাগামহীন কথার জবাব মহাজোটকে উপযুক্ত সময় মহারণেই পেতে হবে। জিয়াউর রহমানের সময় সচিব, এরশাদের মন্ত্রী আবার বর্তমান মহাজোটে মাননীয় অনর্থ মন্ত্রী এককাঠি এগিয়ে বলেছেন, গ্রামের কৃষকরা বড় বেশি বিদ্যুত্ অপচয় করে। কী বিচারবোধ! পুরো একটা গ্রামে ১০টা পাওয়ার পাম্পে যে বিদ্যুতের প্রয়োজন তার চেয়ে একশ’ গুণ বেশি বিদ্যুত্ বড় বড় ভুঁড়িওয়ালাদের এক অফিসে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণে খরচ হয়। তারপরও প্রবাদের মতো, ঝাঁজর বা চালুন বলে সুইয়ের পাছা ট্যারা। মুড়ি ভাজার ঝাঁজর বা চালুন কিংবা ছাকনি যেটার পাছায় হাজারও ছিদ্র সে যদি বলে সুইয়ের পাছা ট্যারা বা ছিদ্র, তাহলে যেমন শোনায়, মাননীয় মন্ত্রীর এ মন্তব্যও ঠিক তেমনই শুনিয়েছে। কোনো বিবেকবান বিচারবোধসম্পন্ন মানুষ এমন মন্তব্য করতে পারেন না। আওয়ামী লীগের নামে কেউ এমন গণবিরোধী মনোভাব পোষণ করতে পারে—এটা ছিল সাধারণ মানুষের কল্পনারও অতীত। এমন মানসিকতা তো মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, জননেতা শামসুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী সর্বোপরি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের লালন-পালন করা আওয়ামী রাজনীতির মানসিকতা হতে পারে না। এসব পণ্ডিতরা এক সময় বাম রাজনীতিতে শরিক ছিলেন। তাই বড় বিস্ময় জাগে কী করে তারা এতদিন এমন গণবিরোধী মনোভাব পুষে রেখেছিলেন। বাম ঘরানার দু’চারজন খ্যাতিমান রাজনীতিককে এই কয়েক বছর আগেও গার্মেন্টের মহিলা শ্রমিকদের মাতারি বলে ব্যঙ্গ করতে দেখেছি। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এদের যে কী ধাতুতে গড়েছেন তা তিনিই জানেন। প্রায় দুই লাখ কোটি টাকার বাজেট হয়েছে। অথচ শতকরা ৯০ জন সাধারণ মানুষ মুহিত সাহেবদের বাজেট নিয়ে মাথা ঘামায় না। বাজারে চালের, ডালের, তেলের, নুনের দাম কত সেটা নিয়েই তারা বেশি চিন্তিত। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যগুলো ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে থাকলে সাধারণ মানুষ খুশি। ক্রয় ক্ষমতার বাইরে গেলে মহাসুন্দর বাজেটও তাদের হৃদয় স্পর্শ করে না। বাড়ির কাছে রাস্তাটা হলে তারা মনে করে দেশে উন্নতি হয়েছে। কাপড় ভিজিয়ে পারাপার হওয়া খালে কালভার্ট হলে তারা ভাবে দেশে উন্নতি হয়েছে। চোখে দেখার মতো কোনো পরিবর্তন না হলে ঢাকঢোল পিটিয়ে দেশের উন্নতির কথা যতই বলা হোক তারা তা গ্রহণ করবে না। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য যেখানে কোনকিছুই হয়নি সেখানেই কেউ কেউ বলবেন, অনেক কিছু হয়েছে। চোখ-কান বুজে, বালুর মধ্যে ঠোঁট লুকিয়ে কাকের মতো সব কিছু অস্বীকারের কেমন যেন মারাত্মক রোগে পেয়েছে। কেউ কারও সীমায় থাকতে চায় না। কেউ কারও পজিশনে সন্তুষ্ট নয়। আরও আরও চাই, বড় বেশি করে চাই। এ যেন এক হবুচন্দ্র রাজার গবুচন্দ্র মন্ত্রীর দেশ। ক’দিন আগে সংসদ সদস্যরা একজন প্রথিতযশা বরেণ্য ব্যক্তি আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের সমালোচনায় সংসদ ফাটিয়ে ফেলার অবস্থা করলেন। এ যেন নাই কাজ তাই খৈ ভাজের মতো। আমি বহু বছর যাবত্ যে কথা বলে চলেছি সেদিন হঠাত্ জনাব আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ সে কথাটাই দৃঢ়ভাবে উচ্চারণ করেছেন। সরকার এবং বিরোধী দল নামে দুটি কিন্তু কার্যকরণে তারা এক ও অভিন্ন। এ উপলব্ধির জন্য তাকে অবশ্যই ধন্যবাদ দিতে চাই। ইদানীং আমাদের সব থেকে বড় সমস্যা তাত্ক্ষণিক সুবিধার আশায় বেশি সংখ্যক বুদ্ধিমান সত্য কথা বলেন না। যখন যা বললে সুবিধা হবে তাই বলেন। এই ক্ষেত্রে মনে হয় এই প্রথম একজন প্রথিতযশা বুদ্ধিজীবী, সাহিত্যিক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ দৃঢ়তার পরিচয় দিয়েছেন। তাকে আবারও অকুতোভয় দেশবাসীর পক্ষ থেকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও অভিনন্দন।
সেদিন হাইকোর্টের মাননীয় বিচারপতি জনাব এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক বিচার আসনে বসে যে ক্ষুব্ধতার পরিচয় দিয়েছেন— অমন গরম মেজাজের কাউকে অন্তত হাইকোর্টের বিচারপতি করা যায় না। অমন মাথা গরম থাকলে তার কাছ থেকে কারও ন্যায় বিচার পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। জনাব এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক সম্পর্কে তোফায়েল আহমেদ বলেছেন, তাকে বিচারপতি বানানোর সময় কোনো পরীক্ষাও নেয়া হয়নি। কারণ তিনি আওয়ামী ঘরানার বা পছন্দের লোক। এরই মধ্যে তিনি বহু মানুষকে তার কোর্টে নিয়ে যা ইচ্ছে তাই অপমান করেছেন। বিচারক হলো আল্লাহর প্রতিনিধি। এ জগত্-সংসারে কত কর্ম আছে কিন্তু বিচারকের আসন পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। যিনি বিচারকের আসনে বসেন তাকে স্রষ্টার কথা মনে রাখতে হয়। আল্লাহর কথা মনে করতে হয়। রাগ-অনুরাগের তার সুযোগ কোথায়? সবই তো আইন এবং বিবেকের কাছে বন্দী। ক্ষুব্ধ এবং রাগান্বিত হয়ে ন্যায় করবেন কীভাবে? শোনা যায় রেলের কর্মচারীদের তিনি বকাঝকা করেছেন; বিমানের এক শ্রেণীর টিকিট কেটে আরেক শ্রেণীতে ভ্রমণ করেছেন। নিজে স্বপ্রবৃত্ত হয়ে এর ওর নামে নিজের কোর্টেই মামলা করেছেন—এ কি করে হয়? নিজেই বাদী, নিজেই তদন্তকারী, নিজেই বিচারক? এ তো হওয়ার নয়। ন্যায় ও সত্য এটাকে অনুমোদন করে না। কিন্তু তাই হয়ে এসেছে এতকাল। তাই প্রবীণ আইনজীবী সাহসী মানুষ ব্যারিস্টার রফিক-উল হক যথার্থই বলেছেন, এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিকের ওপর আল্লাহর বিচার শুরু হয়েছে। আমাদের সংসদের মাননীয় স্পিকার বৃহত্তর ময়মনসিংহের মানুষ। তার ভাব ও ভাষায় বিস্তর আঞ্চলিক প্রভাব আছে। তিনি অবলীলায় আঞ্চলিক ভাব নিয়েই গর্ব ভরে কথা বলেন। কখনও কোনো হীনমন্যতায় ভোগেন না। কখনও সখনও তিনি দু’চারটি খাপছাড়া কথাও বলেন। এই কিছুদিন আগে বিরোধী দল ওয়াকআউট করায় প্রচণ্ড উত্তেজিতভাবে বিরোধী দল ও তাদের নেতা সম্পর্কে অনেক শক্ত শক্ত কথা বলেছেন। যেটা সংসদের অভিভাবক হিসেবে স্পিকারের মুখে বেমানান। কিন্তু তবু তিনি বলেছেন। আমার কাছে মনে হয়েছে সড়ক ভবনের মামলা নিয়ে সংসদ সদস্যদের আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে এই প্রথম তিনি খুবই প্রাঞ্জল ভাষায় বলেছেন, কোনো আদালত যদি জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে যায় তাহলে জনগণ আদালতের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে পারে। সরকারও যদি জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বেশি বাড়াবাড়ি করে তাহলে সরকারের বিরুদ্ধেও প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে। এটাই তো সত্য, খোদার দুনিয়ায় জনগণ পারে না এমন কী আছে? আইন করে পাকিস্তান থেকে আমরা বাংলাদেশ করিনি। জনগণ চেয়েছে রক্ত ঢেলে পাকিস্তানের সমস্ত আইন-কানুন ডুবিয়ে দিয়ে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছি। আল্লাহর পর জনগণই দেশের আসল মালিক-মোক্তার এটা সবাইকে বুঝতে হবে। না বুঝলে মাঝেমধ্যে যা হয় তাই হবে। এর কোনো নড়চড় হওয়ার উপায় নেই। একজন বর্ষীয়ান জননেতা হিসেবে সংসদের স্পিকার জনাব আবদুল হামিদ জাতির অনুভূতিকে ব্যক্ত করেছেন। এ জন্য যেখানে তিনি ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য, সেখানে একজন বিচারক এজলাসে বসে মাননীয় স্পিকারকে রাষ্ট্রদ্রোহী বলার স্পর্ধা দেখিয়েছেন। কেউ অপ্রকৃতিস্থ না হলে সংসদের কথা নিয়ে স্পিকারকে রাষ্ট্রদ্রোহী বলতে পারেন না। সংসদে বলা কথা চ্যালেঞ্জ করার কোনো এখতিয়ার কারও নেই। আর বিশেষ করে আইনের দ্বারা যাদের হাত পা বাঁধা তাদের কেউ যদি নিজের ক্ষমতা দেখানোর জন্য হাইকোর্ট, সুপ্রিমকোর্টের বিচার আসনে বসে অপ্রাসঙ্গিক কথা বলেন অবশ্যই তার বিচার হওয়া উচিত। বিচারালয় কাব্য করার জায়গা নয়, বিচারালয় ন্যায় বিচার করার স্থান। সেখানে বলার চাইতে লেখার দরকার বেশি। সংবিধানের স্পষ্ট লঙ্ঘন করে, বিচারকের শপথ ভঙ্গ করে কেউ যদি বিচারের হাত থেকে অব্যাহতি পেয়ে যায় তাহলে পরবর্তীতে এসব দায়িত্বজ্ঞানহীন কর্মকাণ্ড সংক্রমিত ব্যাধির মতো ছড়িয়ে পড়বে। আমাদের রাজধানীর মহাখালীতে একটি মাত্র কলেরা হাসপাতাল। ফলে এই ভয়াবহ রোগ ছড়িয়ে পড়লে কাউকে বাঁচানো কঠিন হবে। তাই রোগ ছড়িয়ে পড়ার আগেই রুখে দাঁড়ানো উচিত। সরকার এখানে সরকারের মতো আচরণ করছে না। তাই জনগণকেই দেশের মালিকানা প্রমাণ করার জন্য সক্রিয় ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হবে। আর এভাবে কাউকে দেশে অরাজকতা সৃষ্টি করতে দেয়া যায় না। সে সরকারই হোক আর কোনো বিরোধী দলই হোক। যার যার দায়িত্ব সে যদি সঠিকভাবে পালন করতে না পারে তাদের অবশ্য অবশ্যই অব্যাহতি দিতে হবে। আর সে অব্যাহতি দেবে দেশের জনগণ। কারণ জনগণই দেশের আসল বা প্রকৃত মালিক। তাই কবিগুরুর কথাতেই বলি—
‘হে মোর দুর্ভাগা দেশ, যাদের করেছ অপমান
অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান।
মানুষের অধিকারে বঞ্চিত করেছ যারে,
সম্মুখে দাঁড়ায়ে রেখে তবু কোলে দাও নাই স্থান,
অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান।’

শুক্রবার, ৮ জুন, ২০১২

পিতাকে পুত্র

পিতাকে পুত্র


॥ বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরোত্তম ॥

(৯)
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম

১৬ মে বোয়ালমারীর গণহত্যা দিবস নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে ’৭৫-এর ১৫ আগস্টের পরের দিনগুলো থেকে সরে এসেছিলাম। আজ আবার সে দিকে যেতে চাই। কিন্তু তারও আগে দেশের সাম্প্রতিক হালহকিকতের সামান্য কিছু না বললে তুমি খুবই অন্ধকারে থাকবে। আজকাল বড় মারাত্মক মারাত্মক ঘটনা ঘটছে, যা তোমার ধারণারও বাইরে। প্রথমেই একটা ছোট্ট ঘটনা বলি। লম্বাচোড়া মানুষেরা কিছুটা আত্মভোলা হয়। সে েেত্র তুমি-আমি দু’জনেই তো লম্বাচওড়া হওয়ার কারণে এক গোত্রভুক্ত। স্বাধীনতার পর ভাবতাম মানুষ আমাদের কত ভালোবাসে। কিন্তু পরবর্তীকালে দেখলাম আমাদের বহু মানুষ ভালোবাসে ঠিকই, আবার কিছু মানুষ ভালোবাসে না। তার মধ্যে কেউ কেউ না জেনেই। বছরখানেক আগে এক মহিলা রাজনৈতিক কর্মী বলেছিল, ‘যুদ্ধের সময় আপনি আমাদের বাড়িতে ছিলেন। আমার মা-বাবা আপনাকে খাইয়েছেন। আপনি দু-তিন দিন ছিলেন সেখানে।’ আসলে যুদ্ধের নয় মাস তো লোকজনের বাড়িতেই থেকেছি। তাই তাদের বাড়িতে থাকাও বিচিত্র নয়। কিন্তু সে যখন বারবার বলছিল দুই-তিন দিন তাদের বাড়িতে ছিলাম, তখন গ্রামের নামধাম জিজ্ঞেস করে যখন দেখলাম সে এলাকায় একবার গিয়েছিলাম, তখনকার নাগরপুর এখন দেলদুয়ার থানার এলাসিন বাজারের দেিণ আমরা হানাদার বাহিনীর ওপর একটা আচমকা আক্রমণ করেছিলাম। কিন্তু কোনো দিন সেখানে ছিলাম না। নাগরপুর-টাঙ্গাইল রাস্তার পাশে হওয়ায় সেখানে থাকার কোনো সুযোগও ছিল না। তার পরও সে তাদের বাড়িতে জোর করেই তিন-চার দিন রাখবেন, যতœ করে খাওয়াবেনÑ আমি আর কী করতে পারি? আমি যখন থাকব না তখন তারটাই হয়তো প্রতিষ্ঠিত হবে। এই ক’দিন আগে এক ভদ্রলোক এসেছিলেন। তার এখন দেশসেবার খুব আগ্রহ। মুক্তিযুদ্ধের সময় নাকি লন্ডনে ছিলেন। কথাবার্তায় বুঝলাম, তিনি আগাগোড়াই অন্য ঘরানার মানুষ। ছাত্রজীবনে মুসলিম লীগের ছাত্রসংগঠন এনএসএফ করতেন। কিন্তু তোমার প্রতি তার যে এত অশ্রদ্ধা কথা না বললে বুঝতে পারতাম না। যুক্তফ্রন্টের আমলে দুর্নীতি দমন মন্ত্রী ছিল। তাই তুমি খুব দুর্নীতি করেছ। যারা ভালো ভালো মানুষ তাদের নামে মামলা-মোকদ্দমা দিয়ে নাজেহাল করেছ। যখন তাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘থানা-জেলা পর্যায়ে মন্ত্রীরা কারো নামে মামলা দেয় কি? নাকি সেখানকার কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মামলা তৈরি করে?’ লোকটি আইনের মানুষ। ভালো জবাব দিতে পারলেন না। অনেক লেখাপড়া জানা ধনী মানুষ। কিন্তু তাকে খুব একটা স্বাভাবিক মনে হলো না। আমি যে তোমার পাগল, তা বাংলাদেশের কাকপীও জানে। তার পরও ভদ্রলোক তার এক অনুষ্ঠানে নেয়ার দাওয়াত দিতে এসে তোমাকে খারাপ বলছে। ও থেকেই বুঝেছি লেখাপড়া জানলে কী হবেÑ বিচার-বিবেচনার দিক থেকে তেমন সুবিধার নয়। ঠিক তেমনি ঘটনা ঘটেছে আমাদের সর্বোচ্চ আদালতে। আসলে ইদানীং কেউ কারো সীমায় থাকতে চায় না। দু’কথা বলে রাতারাতি কেমন যেন বিখ্যাত হতে চায়। বিচারকেরা বিচারালয়ে বসে বিচারের বাইরে ইদানীং অনেক কথা বলেন। কেন যেন তারা মনে করছেন বিচারের আসনে বসলে যা খুশি তাই বলতে বা করতে পারেন। এসব দেখে বারবার বাবার কথা মনে পড়ে।
আজ থেকে প্রায় ৫০ বছর আগে ময়মনসিংহের জজকোর্টে জমিলা নামে এক মহিলা তার জায়ের বাচ্চাকে উঠানে ছুড়ে মেরে ফেলেছিল। সেই মামলায় মফস্বলের একজন মোক্তার হিসেবে বাবা প্রথম গিয়েছিলেন ময়মনসিংহ জজকোর্টে। মফস্বলের মোক্তার বলে জজ সাহেব বাবাকে খুব তাচ্ছিল্য করে বলেছিলেন, ‘মামলায় কিছু নেই। আসামি ফাঁসির যোগ্য অপরাধী, শুধু একটি ছোট্ট বাচ্চা আছে বলে তাকে যাবজ্জীবন দেবো। তাই অযথা সময় নষ্ট করবেন না।’ বাবার পীড়াপীড়িতে জজ সাহেব সওয়াল জবাবের সুযোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু মাঝপথে একবার থামিয়ে দিয়ে বাবাকে সতর্ক করে বলেছিলেন, ‘আপনি আরো সওয়াল জবাব করলে আসামিকে ফাঁসি দেবো।’ বাবা খুবই রাগান্বিত হয়ে জজ সাহেবকে চ্যালেঞ্জ করে বলেছিলেন, ‘মানুষের বাড়িতে জাগির থেকে লেখাপড়া করিনি। লোয়ার কোর্টে প্র্যাকটিস করলেও নকল করে পাস করিনি। জজের চেয়ারে বসলেই যা খুশি তা করা যায় না। আপনার হাত-পা বাঁধা। আমি যা বলব তা শুনবেন, যে আইন দেখাব তা দেখবেন, আমি যা লেখাব তাই লিখবেন। আপনি বোবা, কালা, অন্ধ।’ এতে জজ সাহেব খুব রাগ করেছিলেন। কিন্তু সওয়াল জবাব শেষে আসামিকে খালাস দিতে বাধ্য হয়েছিলেন এবং এরপর আজীবন তিনি বাবার পরামর্শ নিতেন এবং প্রধান বিচারপতি না হলেও হাইকোর্টের বিচারপতি হয়েছিলেন। কিন্তু কেন যেন এখন বিচারপতিরা এজলাসে বসে নোট নেন কম, বলেন বেশি। অতি সম্প্রতি তেমনই করেছেন বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক। কী মারাত্মক কথা! কয়েক দিন আগে জাতীয় সংসদ চলাকালে স্পিকার আবদুল হামিদ আদালত এবং সরকার সম্পর্কে একটি মন্তব্য করেছেন। এমনিতে হামিদ সাহেব কিশোরগইঞ্জা মানুষ। তার প্রত্যেকটি কথায় আঞ্চলিক টান থাকে। তিনি তা নিয়ে তেমন কিছু মনে করেন না। স্বাচ্ছন্দ্যেই যখন যা মনে হয় আঞ্চলিক ভাষা এবং ভাব নিয়ে কথাবার্তা বলেন। অনেক সময় বেখাপ্পা কথাও বলেন। কিন্তু হাইকোর্টের বিচারপতি তার যে কথায় প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন, সেখানে স্পিকার আবদুল হামিদ কোনো অসংলগ্ন বা অসঙ্গত কথা বলেননি বরং যথার্থ একজন দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক নেতার মতো বলেছেন, ‘আদালত যদি জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বেশি বাড়াবাড়ি করেন তাহলে তার বিরুদ্ধে জনগণ রুখে দাঁড়াতে পারে। সরকারও যদি বাড়াবাড়ি করে তার বিরুদ্ধেও জনগণ রুখে দাঁড়াতে বা প্রতিরোধ করতে পারে।’ 
রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে জনগণ কি পারে না? সব পারে। সমাজব্যবস্থায় আল্লাহর পরই জনগণের স্থান। জনগণ বিশৃঙ্খল থাকে বলে তাদের মাথায় কাঁঠাল ভেঙে সবাই খায়। কিন্তু জনগণ কখনো একত্র হলে পৃথিবীর কোনো শক্তি নেই যে তাদের ঠেকাতে পারে। এই সাদা কথাটা স্পিকার অতি সুন্দরভাবে খুবই স্পষ্ট করে বলেছেন। কিন্তু চুলকিয়ে ঘা করার মতো বিচারপতি এজলাসে বসে একেবারে অপ্রাসঙ্গিকভাবে স্পিকারের ওই কথাকে রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল বলে মন্তব্য করে বিচারকের আসনের চরম অমর্যাদা করেছেন। মাননীয় স্পিকার তার মন্তব্যটি সংসদ চলাকালীন সংসদে করেছেন। বাইরে করলেও না হয় একটা আলোচনার সুযোগ ছিল। কিন্তু সংসদের ভেতরে কোনো আলোচনা চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ কারো নেই, বিশেষ করে আদালতের লোকজনের। সংসদের কোনো কথা নিয়ে বিচার সালিশ করা যায় না। সাধারণ মানুষ যা খুশি তা আলোচনা করতে পারেন। কিন্তু কোনো বিচারক বিচার আসনে বসে সংসদে আলোচিত কোনো কিছু নিয়ে মন্তব্য করা সংবিধান পরিপন্থী এবং শপথ লঙ্ঘনের শামিল। অনুরাগ-বিরাগের বশবর্তী হয়ে বিচার আসনে বসা যায় নাÑ এটা ইদানীং অনেকেই ভুলে গেছেন। আর ভুলবেনই না কেন, আওয়ামীপন্থীরা মতায় এলে তাদের পছন্দের বিচারক, বিএনপি এলে জ্যেষ্ঠতা ভেঙে তাদের পছন্দের বিচারক। এখানে গুণ, মান, যোগ্যতা, মেধার কোনো মূল্য নেই। বড় এক অরাজক অবস্থা। কিভাবে যে এ থেকে জাতি পরিত্রাণ পাবে! এখন এই বিচারককে যদি সরিয়ে দেয়া না হয়, তাহলে কলেরা রোগের মতো ছড়িয়ে পড়বে। তাই এর একটা হেস্তনেস্ত হওয়া উচিত। চার দিকে বড় বেশি উত্তেজনা। রাস্তাঘাটে, স্কুল-কলেজে, কলকারখানায় কোথাও শান্তি ও স্বস্তি নেই। তোমার মৃত্যুর পর সে যে কী জাতীয় দুর্যোগ নেমে এসেছিল আমার এবং আমার পরিবারের ওপরÑ সেই দুঃসময়গুলো নিয়ে যতটা সম্ভব এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছি। এখন তো আর তুমি একা নও, তোমার ১৬ কোটি সন্তান। তোমাকে বলা এ কথা তারাও জানতে চায়। 
মা আরো বলেছিলেন, ‘রাস্তায় বেরুলে দেখবি আল্লাহর পথে শুধু আলোই আছে কোনো অন্ধকার নেই।’ আমার নানা খন্দকার আবদুল ওয়াহেদ কালু মিয়া বলতেন, ‘খোদা কা ঘরমে দের হ্যায়, আন্ধের নেহি’। এটা একটা বিখ্যাত ফারসি শায়ের। মা চলে যাওয়ার পরই পুরোদমে প্রস্তুতি চলছিল। হাতে কোনো টাকা-পয়সা ছিল না। টাকা-পয়সার চিন্তাও করতাম না। সর্বমোট হাজার আড়াই টাকা, একটা হাতঘড়ি, ’৬৮ সালে মায়ের দেয়া আট আনি সোনার একটা আংটি, সহকর্মীদের কাছে চার-পাঁচ ভরি সোনার চেইনÑ এই যা সম্বল। আমি সব সময় পাজামা-পাঞ্জাবি আর মুজিবকোট পরতাম। পাজামা-পাঞ্জাবি পরে বেরুতে চাইনি। শার্ট-প্যান্ট পরে বেরুতে চেয়েছিলাম। শার্ট-প্যান্ট ছিল না। কোথা থেকে দুলাল একটি শার্ট আনলে সেটা গায়ে লেগেছিল। নুরুন্নবী নিয়ে এসেছিল ১০-১১ টাকার একজোড়া স্যান্ডেল। সমস্যা হলো প্যান্ট নিয়ে। শেষ পর্যন্ত প্রখ্যাত সাংবাদিক গজনবী রোডের মোদাব্বের দাদুর একটা প্যান্ট কী করে কে যেন নিয়ে এলো। প্যান্টটা লম্বায় হলেও কোমর লাগছিল না। অনেক চেষ্টা করেও কিছু করা গেল না। ওইভাবেই শার্ট ওপরে দিয়ে কোনো রকম চালিয়ে নেয়ার ব্যবস্থা হলো। ২১ আগস্ট দুই-আড়াইটার দিকে ঢাকা থেকে টাঙ্গাইলের উদ্দেশে রওনা হলাম। বড় ভাই কেবলই একটি ছোট্ট টয়োটা গাড়ি কিনেছিলেন। আগে কেউ সে গাড়িতে চড়েনি। নম্বরটা ভুলে গেছি, ১২১৫ অথবা ১৫১২ হবে। কাউকে গাড়ি চালাতে দেইনি, নিজেই চালাচ্ছিলাম। সাথে লুৎফর, দুলাল, রেজাউল করিম, খসরু আরো যেন কে কে ছিল। রাস্তায় তেমন বিপদের আশঙ্কা করিনি। টাঙ্গাইল দিয়ে পার হওয়ার সময় কাউকে কোনো খবর দেইনি। মধুপুর পেরিয়ে যাওয়ার আগে কেউ বুঝতেও পারেনি। কারণ সে দিন আমি যে গাড়িতে যাচ্ছিলাম ওই গাড়িতে আগে চড়িনি। তাই কেউ খেয়াল করেনি। আমাদের সাথে রীবাহিনীর একটা জিপও ছিল। তাই আরো দৃষ্টি পড়েনি। সাড়ে পাঁচ-ছয়টার দিকে জামালপুর ফেরিঘাটের কাছে পৌঁছে দেখি ফেরি ওপারে শেরপুরের দিকে। ঘাটে অপো করতে ইচ্ছে করছিল না। একটা নৌকা ভাড়া করে তখনই পার হওয়ার কথা চিন্তা করলাম। আগে ভেবেছিলাম জামালপুর ফেরি পার হওয়া গেলে যতটা সীমান্তের কাছে যাওয়া যায়, গিয়ে গাড়ি ছেড়ে দেবো। কিন্তু ফেরি জামালপুরের পাড়ে না থাকায় গাড়ি ছেড়ে তাড়াতাড়ি পার হওয়ার চেষ্টা করি। আমাদের পৌঁছে দিয়ে গাড়ি নিয়ে ঢাকায় ফিরতে মোদাব্বের দাদুর ছেলে ইকবাল হাসান মন্টি মামার খুবই কষ্ট হয়েছিল। আমরা নৌকায় করে প্রথম প্রথম শেরপুরের পাড়ে নামার চিন্তা করেছিলাম। কিন্তু নৌকায় উঠেই মনে হলো শেরপুরে না নেমে আরো উজিয়ে গেলে কেমন হয়। নদীপথেও একেবারে ভারত সীমান্তের কাছাকাছি যাওয়া যায়। কিন্তু জামালপুর থেকে আঁকাবাঁকা নদীপথে যে অত দূর তা বুঝতে পারিনি। নৌকার মাঝি আমাদের চিনতে পারেনি। সে সাধারণ মানুষই মনে করেছে। আমরা নদীপথেই জিঞ্জিরাম, মহেন্দ্রগঞ্জ অথবা কামালপুরের কাছাকাছি কোথাও যেতে চেয়েছিলাম। এখন ব্রহ্মপুত্র নদী একেবারে শুকিয়ে গেছে। কিন্তু তখন এমনটা ছিল না। কোনো কোনো জায়গায় দুই-তিন মাইল প্রস্থ ছিল। সারা রাত চলার পর নৌকা থেকে নামলে আস্তে আস্তে সকাল হলো। খোঁজ নিয়ে জানলাম আমরা কামারের চরে নেমেছি। কামারের চর আগে থেকেই চিনতাম। মুক্তিযুদ্ধের সময় কামারের চরে গিয়েছিলাম। উত্তর দিকে হাঁটতে শুরু করলাম। তখন এত এলোমেলো রাস্তা ছিল না। তাই ভুল হওয়ার কোনো কারণ ছিল না। কামারের চর থেকে ডোবার চর তারপর ঝগড়ার চর সেখান থেকে বকশীগঞ্জ। চন্দ্রবাজ, পলাশতলা, লাউচাপড়া বাজার আমরা চলছি তো চলছিই, রাস্তা ফুরায় না। দুপুর গড়িয়ে গেল। সেই আগের দিন দুপুরে খেয়েছি। রাতে একটুও দানাপানি জোটেনি। পকেটে কিছু পয়সা আছে কিন্তু খাবার পাবো কোথায়? রাস্তায় কেউ চিনতে পারুক এটা আমরা চাইনি। এখন যেখানে-সেখানে রাস্তাঘাটে যা খুশি তা-ই পাওয়া যায়। কিন্তু তখন কিছুই পাওয়া যেত না। দুপুরের দিকে সবাই কেমন যেন নির্জীব হয়ে পড়ছিল। আমারও পা ধরে আসছিল। ুধার জ্বালায় থাকতে না পেরে রাস্তার ধারে এবাড়ি-ওবাড়ি থেকে চাল চেয়ে চিবিয়ে পানি খাচ্ছিলাম। তাতেও কোনো সুবিধা হচ্ছিল না। বিকেল চার-সাড়ে চারটার দিকে কেন যেন চলন-শক্তি রহিত হয়ে পড়ছিল। বারবার মনে হচ্ছিল আর বুঝি পারছি না, মাথা ঘুরে চেতনা হারিয়ে ফেলার অবস্থা। তবু পাড়ি দিতেই হবেÑ উপায় নেই। (চলবে) 

রবিবার, ৩ জুন, ২০১২

কুকুর হইতে সাবধান!



ব ঙ্গ বী র কা দে র সি দ্দি কী বী র উ ত্ত ম
বানরের হাতে খোন্তা থাকলে যেমন হয় আমাদেরও তেমন হয়েছে। কারও কোনো মান মর্যাদার লেশমাত্র নেই। যারা মারে আর যারা মার খায় উভয়েরই একই অবস্থা। চারদিকে এক অরাজক বিশৃঙ্খলায় ভরা। আল্লাহতায়ালা বলেছেন, ‘আমি শিশু বানাই কাউকে কাউকে আয়ু দেই। শিশুকালে যেমন অবুঝ অসহায় থাকে, অন্যের সাহায্য ছাড়া চলতে পারে না, বয়সীদেরও এক সময় অমন অসহায় অবুঝ করি।’ জানি না আমাদের সমাজ, সংসার, আমাদের সরকারের তেমন হয়েছে কিনা। তা না হলে সর্বক্ষেত্রে এমন হবে কেন? স্বাধীনতা বা মুক্তিযুদ্ধের এতগুলো বছর পরও কেন আমরা পাকিস্তানি হানাদারদের পাক হানাদার, পাক বাহিনী বলে ডাকব? আমার বড় মেয়ে কুড়িমণির যখন ৩-৪ বছর বয়স, তখন সখীপুরের কালিয়ানের ঘাওগাচালায় বিদ্যুত্, রাস্তা কিছুই ছিল না, বড় কষ্ট করে যেতে হতো। নির্মাণ কাজ চলছিল, তাই তখনও আমাদের বাড়িতে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা ছিল না। পাশের বাড়িতে একবার দুপুরের খাওয়ার ব্যবস্থা হয়েছিল। দীপ, কুড়ি আমাদের দু’জনের মাঝে বসে খাচ্ছিল। গ্রামের হিন্দু বাড়ির রান্না এমনিতেই কিছুটা আলাদা। তাছাড়া শ্রী সুরেশ চন্দ্র সরকারের স্ত্রী খুবই সংসারী মানুষ, আমাকে ভীষণ সম্মান করে। এসব কারণে আয়োজন ছিল বিস্তর। ছেলে-মেয়েরা বেশ আনন্দ করে খাচ্ছিল। মুরগির মাংসে একটু বেশি ঝাল ছিল যা আমাদের জন্যও বেশি। পুতুলের মতো আমাদের ছোট ছোট বাচ্চাদের চোখ-মুখ লাল হয়ে কপাল ঘেমে গাল দিয়ে পানি পড়ছিল। ওদের মা এবং আমি বার বার মুছে দিচ্ছিলাম। আমি গামছা দিয়ে আর ওদের মা তার আঁচল দিয়ে। এ রকম এক সময় কুড়িমণি আচমকা বলে উঠল, ‘আম্মু, আম্মু, কী মিষ্টি ঝাল।’ কুড়ির অভিব্যক্তি শুনে বিস্মিত হয়ে গিয়েছিলাম। পরে বুঝলাম ‘ও’ কী বলতে চাচ্ছে। ‘ও’ বোঝাতে চাচ্ছে ঝালে মুখ পুড়ে গেলেও খাবারটা খুব মজার হয়েছে। তাই বলেছে, ‘আম্মু, আম্মু, কী মিষ্টি ঝাল।’ আমাদেরও কি তেমন হয়েছে? ‘ও’তো ছিল অবুঝ শিশু। ৩-৪ বছর বয়স। খাবার স্বাদ লাগায় ঝালকে মিষ্টি বলেছিল। আমরাও কি তেমন বোধশক্তিহীন অবুঝের মতো বলছি কী মহান পাকবাহিনী, পূত-পবিত্র লুটতরাজ, খুন-খারাপি, হত্যা, নারী ধর্ষণ! তা না হলে তাদের পূত-পবিত্র করতে অমন করে নিজের খেয়ে পাকবাহিনী, পাক হানাদার বলতে যাব কেন? একদিকে হানাদার আবার অন্যদিকে হানাদার বাহিনীর নামের আগে শর্টকাট করে পাকিস্তানের স্থলে পাক বসিয়ে নাপাকদের পূত-পবিত্র করার অশুভ অপচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে বহুদিন। হানাদার তো অত্যাচারী, হানাদার তো দখলকারী, হানাদার, লুটকারী, ধর্ষক সেই অর্থে নাপাককে পাক পবিত্র বলতে যাব কেন? খাদ্যের আগে ‘অ’ অখাদ্য, বিচারের আগে ‘অ’ অবিচার, শিক্ষার আগে ‘অ’ অশিক্ষা, রুচির আগে ‘অ’ বসালে যদি অরুচি হয়। তাহলে অত্যাচারী পাকিস্তান হানাদারের আগে পাক বসিয়ে জাতিকে এমন বিভ্রান্ত করার চেষ্টা কেন? কোনো ভালো জিনিসের যদি শুধু একটা ‘অ’-এর কারণে খারাপ মানে হয়ে যায়, খারাপ জিনিসকেও ভালো শব্দ দিয়ে পাক ও পবিত্র করার চেষ্টা করা যায় না? নিশ্চয়ই যায়। মনে হয় এতকাল তাই করা হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে। পাকের অর্থ যদি পূত-পবিত্র হয় তাহলে আর কিছু বছর এভাবে চললে ভাবীকালে পাকিস্তান হানাদারদের আর কেউ খারাপ বলবে না। তাদের নামের আগে পাক, কাজের আগে পাক থাকলে তারা নাপাক হয় কী করে? শুধু নামের কারণে এক সময় তারা হয়তো পাক পবিত্র হয়ে যাবে। ৪-৫ দিন আগে হঠাত্ সুনীল কুমার গুহের একটা বই পড়ে অবাক হলাম। মনে হলো আমাদের কপাল খারাপ। হানাদারদের কপাল আদতেই ভালো। পশ্চিমবঙ্গের সুসাহিত্যিক বুদ্ধদেব গুহর কাকা সুনীল কুমার গুহের বঙ্গবীর বাঘা সিদ্দিকী নামে লেখা বইটির কথা ভুলেই গিয়েছিলাম। সেই ’৭৩-এ লেখা বইতেও নানা জায়গায় ‘পাকবাহিনী’ ‘পাকবাহিনী’ রয়েছে। এ কী করে সম্ভব, ভেবেই পাই না। তবে কি আমার ছোট্ট মেয়ের ‘কী মিষ্টি ঝালের’ মতো। এ যেন হারামজাদা পাক হানাদার! জানি না আমাদের জীবদ্দশায় শিক্ষিত বাঙালির এ ভ্রম কাটবে কিনা? কত সাহিত্যিক, সাংবাদিক, নাট্যকার এখনও হানাদারদের পাক হানাদার, পাকবাহিনী বলে নাটক রচনা করে ভীষণ খ্যাতি অর্জন করেছেন। সারা জাতির মাথায় যদি পচন ধরে রাজনৈতিক পিতাহারা একজন এতিম একা একা কিইবা করতে পারি? মুক্তিযুদ্ধের সময় আমি কখনও একা কিছু করিনি, করতেও পারিনি। দিশেহারা হাবুডুবু খাওয়া দেশবাসীর সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে ছিলাম। বলেছিলাম, ‘উদয়ের পথে শুনি কার বাণী, ভয় নাই ওরে ভয় নাই। নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই।’ শত শত হাজার হাজার দেশপ্রেমিক কাতারবন্দী হয়ে নিজেরাই কাদেরিয়া বাহিনী গঠনের মধ্য দিয়ে এক মহাবিজয় অর্জন করেছিল। আজ চেতনাহীন, আত্মমর্যাদাহীন জাতির জন্য কিইবা করতে পারি? বয়স হয়েছে, আজ জীবন গেলে কোনো দুঃখ হবে না। কিন্তু কীভাবে জীবন দেব অন্ধকারে পথ খুঁজে পাচ্ছি না। শুধু শুধু কবি নজরুলের বাণী বার বার মনে পড়ছে, ‘গঙ্গায় ডুবিয়াছে হায় ভারতের দিবাকর, উদিবে সে রবি আমাদের খুনে রাঙিয়া পুনর্বার।’ জানিনা সেখানে আমার খুন বা রক্তের আদৌ প্রয়োজন হবে কিনা!
সে যে কী নিদারুণ নির্বোধ, লাগামহীন প্রশাসনের যাঁতাকলে আমরা দিবারাত্রি নিষ্পেষিত তা বলার মতো নয়। মাত্র ক’দিন আগে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বললেন, ‘সাংবাদিকরা পুলিশ থেকে দূরে থাকুন।’ ছেলেবেলায় ধনবানের দরজায় দেখতাম ‘কুকুর হইতে সাবধান’। ছোট্ট মন্ত্রী সেটাই কি মিন করেছেন? পুলিশ বাহিনী এক হিংস্র জীব, তাদের থেকে দূরে থাকুন। সভ্য সমাজে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় পুলিশ জনগণের প্রধান আশ্রয় তারপর বিচার বিভাগ। সেই পুলিশ হতে সাবধান হতে হবে কেন? দূরে থাকব কেন? এ দিয়ে তারা কি তাদের অযোগ্যতা ঢাকতে চান? নিশ্চয়ই আমরা কোনো একজন পুলিশকে অসভ্য বলতে পারি। ব্যক্তিগত পর্যায়ে যে কোনো পুলিশ খুনি, ধর্ষক, লুটেরা হতে পারে, কিন্তু সমগ্র পুলিশ বাহিনী নয়। সমগ্র পুলিশের উপর দোষ চাপালে অথবা সত্যিই যদি তারা তেমন রোগাক্রান্ত হয় তাহলে পুরো সমাজই অচল হয়ে পড়বে। আরও বিস্ময়ের ব্যাপার, মাননীয় মন্ত্রীর মন্তব্যের প্রায় এক সপ্তাহ পার হয়ে গেলেও না মন্ত্রী পদত্যাগ করলেন, না এমন অপমানজনক বিশেষণে বিশেষিত করায় একজন পুলিশ এ নিয়ে উচ্চবাচ্য করল। কেন যেন সবার বোধশক্তি একেবারে ভোঁতা হয়ে গেছে। কোনোকিছু কাউকে স্পর্শ করে না। ক’দিন আগে কুমারী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির আগের চাইতে অনেক উন্নতি হয়েছে।’ সাগর-রুনিকে মেরে ফেলা হলো, কূল-কিনারা হলো না। রাস্তাঘাটে প্রতিদিন দুর্ঘটনায় লোক মারা যায়, প্রতিকার নেই। খুন-খারাপি, হাইজ্যাক লেগেই আছে। রাজনৈতিক হত্যা, গুম, মন্ত্রণালয়ে ঘুষ কেলেঙ্কারি, তারপরেও যদি কেউ উন্নতি মনে করে তাহলে তাকে উটপাখি ছাড়া আর কী বলা যায়? সেদিন আবার বলেছেন, ‘পুলিশের ব্যবহার আগের চাইতে অনেক ভালো হয়েছে’ এবং রিপোর্টার্স ইউনিটিতে সাংবাদিকদের একত্রিত করে এও বলেছেন, ‘পুলিশের আচার-আচরণ আগের চাইতে যে ভালো হয়েছে সে সার্টিফিকেট অতি অবশ্যই আপনাদের দিতে হবে।’ একজন কুমারী মিনিস্টার বললে আওয়ামী সাংবাদিকরা হয়তো অমন সার্টিফিকেট দিলেও দিতে পারেন। কিন্তু টিভি ফুটেজ এবং ধারণ করা ছবিগুলো এক্ষেত্রে কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ ছবি তো মিথ্যা বলতে শিখেনি। কিছুদিন আগে আন্দোলনকারীদের রাস্তায় ফেলে পুলিশ বুট দিয়ে গলা চেপে ছিল। সেদিন যশোরে দু’হাতে গলা টিপে ধরেছে। প্রথম আলোর তিন সাংবাদিককে আচ্ছা রকম পিটিয়েছে। পুরনো ঢাকার আদালত পাড়ায় পুলিশ ক্যান্টিনে তরুণীর শ্লীলতাহানি করতে গেলে তার চিত্কার-চেঁচামেচিতে আইনজীবী, সাংবাদিকরা ছুটে গেলে তাদের মেরে তক্তা বানিয়েছে। এসবকে যদি ভালো আচরণ বলতে হয় তাহলে খারাপ আচরণ বলব কাকে? আর তেমন হলে মাননীয় ছোট মন্ত্রী অমন বলবেন কেন? পুলিশ থেকে সাবধান! কোনটা সত্য? সাধারণ মানুষ বড় সমস্যায় পড়েছে। রক্ষক যদি ভক্ষক হয় তাহলে তো কুমিরের বাচ্চার কোনো উপায় নেই। কী নিদারুণ নির্বুদ্ধিতা। বিএনপি সরকারের পুলিশের নির্যাতনের কথা তুলে ধরতে তার দাঁত ভাঙার উপমা দিয়েছেন। আমরা কেউ জানি না কবে কোনদিন পুলিশের হাতে মাননীয় মন্ত্রীর দাঁত ভেঙেছে। শুনেছিলাম, মন্ত্রী হওয়ার পর পড়ে গিয়ে মাজা ভেঙেছিল। সে সময় দাঁত ভেঙেছিল কিনা তা তো জানি না। তবুও তর্কের খাতিরে যদি মেনেও নেই, মন্ত্রী হয়ে কি এখন আমাদের মাথা ভাঙবেন? তবে কেন ছেলেবেলায় পড়েছিলাম, ‘কুকুরের কাজ কুকুর করেছে, কামড় দিয়েছে পায়। তা বলে কুকুরে কামড়ানো কিরে মানুষের শোভা পায়।’ কত বছর আগে হিংসা, প্রতিহিংসার ব্যাপারে কবি অমন ভাবতে পারলেন, অথচ এই আধুনিক যুগেও আমরা কেন পারছি না। বঙ্গবন্ধু মাঝে মাঝেই বলতেন, ‘চোরা না শুনে ধর্মের কাহিনী।’ জানি মহাজোটের কর্ণধারেরা আমার অনেক কথাই শুনবেন না। কিন্তু তাদের জেনে রাখা উচিত ‘পুরনো চাল ভাতে বাড়ে।’ আমরা আমাদের অভিজ্ঞতা কারও কাছ থেকে ধার করে আনিনি। তিল তিল শ্রমে-ঘামে অর্জন করেছি। তাই বলছি, ‘সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কখনও কারও বন্ধু নয়। বিরোধীদের অথবা আন্দোলনকারীদের অত্যাচার করলে, দাঁত কেলিয়ে হাসবেন না, বেশি বগল বাজাবার চেষ্টা করবেন না। সব বিরোধী দল মিলে পুরো এক বছর সংগ্রাম করে সরকারকে যতটা অপ্রিয় করতে পারত তার দশগুণ বেশি অপ্রিয় করে দিয়েছে সেদিন ঢাকা কোর্ট আঙিনায় মেয়েদের শ্লীলতাহানির চেষ্টা করে। মনে হতে পারে বিরোধী দলের চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুককে মহাজোটের প্রিয় পুলিশরা নির্যাতন করে ভালো করেছে, প্রমোশনও পেয়েছে কিন্তু সরকারের কতটা বেজেছে তা পরে বোঝা যাবে। মহাজোট তাদের নিজেদের মনে করলেও তারা মহাজোটকে নিজের মনে করে না। নতুন যারা আসবেন তাদের প্রিয় হওয়ার জন্য যা যা করা দরকার সে ট্রেনিং তাদের বহু আগে থেকেই আছে। বাংলাদেশ হওয়ার পর সরকারে সব সময় আওয়ামী বিরোধীরাই থেকেছে, তাই যাদের যেখানে দেয়া হবে উপরে উপরে প্রেমিক মনে হলেও তারা অধিকাংশই বিরোধী। আর দু’চারজন অদক্ষ, যোগ্যতাহীন অপদার্থ প্রেমিক সরকারকে আরও বেশি করে ডুবাতে পারে। একটু চিন্তা করে দেখবেন। কারও কারও অতি তত্পরতা ষড়যন্ত্রের অংশও হতে পারে। একটু ধীরে-সুস্থে ভেবে দেখতে পারেন।
পহেলা জুন প্রেস ক্লাবে দৈনিক আমার দেশ পত্রিকা অন্যায়ভাবে বন্ধের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উদযাপিত হলো। দৈনিক আমার দেশ’র সম্পাদক মাহমুদুর রহমান যথার্থই সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। আদালত অবমাননার অভিযোগে সুপ্রিমকোর্টে এর আগে কেউ নিঃস্বার্থ ক্ষমা প্রার্থনা ছাড়া অভিযোগ অস্বীকার করেনি। তিনিই প্রথম এক বিরাট দুঃসাহসিকতার পরিচয় দিয়ে কারাবরণ করেছেন, নতিস্বীকার করেননি। এটা নৈতিকতার জগতে সাহসী সাংবাদিকতার এক উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে থাকবে। গত দেড় বছর নিয়মিত দৈনিক আমার দেশ’এ লিখি। সে কারণে পত্রিকাটির প্রতি একটা স্বাভাবিক টান অনুভব করি। যদিও ইদানীং দেশ ও সমাজে সৌজন্য অনেকটাই কমে গেছে। দৈনিক পত্রপত্রিকা এমনিতেই সমাজে আলোচিত মানুষদের সৌজন্য সংখ্যা পাঠায়। নিয়মিত লেখক বা সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকদের জন্য সৌজন্য সংখ্যা পাওয়া একটা নীতিমালার অংশ। অথচ দেড়-পৌনে দুই বছর আমার দেশ এবং অন্যান্য পত্রিকায় লিখলেও এক কপি সৌজন্য সংখ্যা আসে না, কিনেই পড়ি। তারপরও যেহেতু নিয়মিত লিখি। তাই তাদের অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম। কবি আবদুল হাই শিকদার অসাধারণ উপস্থাপনা করছিলেন। বিকাল সাড়ে চারটায় গিয়ে ছ’টা পর্যন্ত অনেকের বক্তব্য শুনেছি। যদিও পরম শ্রদ্ধেয় ব্যারিস্টার রফিকুল হকের বক্তব্য শুনতে পাইনি। জনাব আতাউস সামাদ এবং রুহুল আমীন গাজী দারুণ সুন্দর বক্তব্য রেখেছেন। বর্তমান স্থানীয় সরকার মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম প্রসঙ্গ আনতে গিয়ে জনাব আতাউস সামাদ আমার প্রসঙ্গ এনেছিলেন। দু’একজন বক্তা নিশ্চিত হতে চাচ্ছিলেন বর্তমান সরকার সাংবাদিকসহ দেশবাসীর উপর যে নির্যাতন চালাচ্ছে অন্য কেউ এলে সে নির্যাতন চালানো হবে না, পরিবর্তন হবে তার গ্যারান্টি কোথায়? কথাটায় বেশি জোর দিচ্ছিলেন কবি ফরহাদ মজহার। এক পর্যায়ে বিএনপির নেতা, সাবেক আমলা মাননীয় সংসদ সদস্য এম.কে. আনোয়ার জবাব দিতে গিয়ে বললেন, তারা আবার সরকারে গেলে সাংবাদিকরা নির্যাতিত হবেন না, মানুষের উপর জোর-জুলুম হবে না। কেন যেন ভদ্রলোকের সঙ্গে একমত হতে পারলাম না। ১৯৭১-এ জনাব এম. কে. আনোয়ার পাকিস্তানি সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন। অন্যদের মতো পাকিস্তানের হুকুম তামিল করেছেন। বাংলাদেশ হলে বাঙালি হয়েছেন। সচিব পদ অলঙ্কিত করে অবসর নেয়ার আগেই রাজনীতিক হয়েছেন। যে পাকিস্তানি পুলিশ, ওসি, ডিসি দিয়ে বঙ্গবন্ধুর মতো বিশাল ব্যক্তিত্বের মানুষ ভালোভাবে দেশ চালাতে পারেননি। যাদের নিয়ে অতীতে চারদলীয় জোট পারেনি, বর্তমান মহাজোট পারছে না, এসব খোলনলচে নিয়ে কীভাবে বিএনপি বা অন্য কেউ ক্ষমতায় গেলেই সুন্দরভাবে চলবে—কেন যেন মন সায় দিতে চায়নি। আমরা জামায়াতে ইসলামের সঙ্গে রাজনীতি করি না। একই মঞ্চে অংশ নেই না। এটা আমাদের কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের দলীয় সিদ্ধান্ত। তাই জামায়াতে ইসলামের এমপি জনাব হামিদুর রহমান আজাদের বক্তৃতার পর আমি অংশ নেইনি। তার মানে এই নয় বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধিত জামায়াতে ইসলামের কেউ এদেশে থাকবে না বা রাজনীতি করবে না। আমাদের বক্তব্য স্বাধীনতা যুদ্ধে তাদের ভূমিকার জন্য দেশবাসীর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা না করা পর্যন্ত বা ক্ষমা না পাওয়া পর্যন্ত তাদের নিয়ে কোনোকিছু ভাবা যায় না। রাজনীতির স্বার্থে অন্যরা যা খুশি করে করুক, তাতে আমাদের মাথাব্যথা নেই।

শুক্রবার, ১ জুন, ২০১২

পিতাকে পুত্র


॥ বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরোত্তম ॥

(৮)
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
কত চেষ্টা করি তোমাকে সব কিছু জানাতে; কিন্তু অশান্ত বাস্তবতা কেন যেন মাঝে মধ্যেই এলোমেলো করে দেয়। চেষ্টা করি নিরাসক্ত থাকতে কিন্তু পারি না। সারা দুনিয়ার পরিবেশটাই কেমন যেন অশান্ত, লাগামহীন। কোথাও কোনো মানবিক মূল্যবোধের স্থান নেই। সবাই নিজের মতা দেখাতেই ব্যস্ত। এখন মানুষের কোথাও গিয়ে বিচার পাওয়ার ভরসা নেই, আশ্রয় নেয়ার জায়গা নেই। চোখ-কান বন্ধ করে নিজের স্বার্থ দেখার এত উলঙ্গ প্রবণতা, এত হৃদয়হীনতা মনে হয় আইয়ামে জাহিলিয়াতের দিনে আরব মরুভূমিতেও ছিল না। ইদানীং সে যে কী ঘটছে তা বলার মতো নয়। হত্যা, গুম, ঘুষ, দুর্নীতি সমাজ ও প্রশাসনের গলার মালা তো হয়েই আছে তার ওপর তোমার সময় যে চিকিৎসা-শিা ছিল সেবা, সেটা এখন হয়েছে সবচেয়ে বড় ব্যবসায়। এই তো ক’বছর আগেও বড় বড় ব্যবসায়ের মধ্যে ছিল যুদ্ধাস্ত্র, নেশা, খেলনা আরো কিছু কিছু ছোট-বড় মোটরযান, বিমান, নৌযান, ভারী যন্ত্রপাতি। কিন্তু বিশেষ করে বর্তমান বাংলাদেশে মনে হয় সব ব্যবসায় বাণিজ্যের চেয়ে শিা ও স্বাস্থ্যের ব্যবসায় বেশি লাভজনক এবং দুর্নীতিগ্রস্ত। আগে চিকিৎসা ও শিা ছিল দাতব্য। এখন শিা হয়েছে ভীষণ ব্যয়বহুল। স্বাস্থ্যসেবা বা চিকিৎসা আরো বেশি ব্যয়নির্ভর। দেশের প্রতি, দেশের জনগণের প্রতি কারো যেন কোনো দায়দায়িত্ব নেই, কোনো দায়বদ্ধতা নেই। কেমন যেন একটা ফ্রিস্টাইল। ওষুধে ভেজাল, ডাক্তারিতে ভেজাল, মানুষ কোথায় কার কাছে যাবে? অনেক ডাক্তারের ওষুধ কোম্পানির সাথে কমিশনের চুক্তি আছে। যে ডাক্তার যার কোম্পানির যত ওষুধ লিখবে তত কমিশন পাবে। সরকারি চাকরিতে অনেকের মন বসে না, সব সময় মন পড়ে থাকে কিনিকের দিকে। কারণ সেখানে গেলেই পয়সা। পয়সার নেশায় প্রায় সবাই মাতোয়ারা। একজন মানুষের কত পয়সাই যে লাগে বুঝে উঠতে পারি না। ২০-৫০ বছর আগেও গ্রামবাংলা ছিল শান্তির নীড়; কিন্তু এখন সেখানেও এক নিদারুণ অশান্তি। সবার আরো আরো বেশি করে চাই। কেউ ভাবে না অত অর্থ দিয়ে কী হবে? অর্থের কারণে কেউ কাউকে সময় দিতে পারে না। স্বামীর স্ত্রীর জন্য যেমন সময় নেই, স্ত্রীরও তেমন সময় নেই কারণ তার সমাজ উন্নয়নে কত কাজ। ছেলেমেয়েদের ফার্মের মুরগির মতো কোনো অর্থ উপার্জনের কারখানা নামে তথাকথিত কোনো শিাপ্রতিষ্ঠানে পাঠিয়ে হাঁফ ছেড়ে বাঁচার চেষ্টা। বিত্তশালী অনেকেই বুঝতে চান না পিতা-মাতার প্রত্য সান্নিধ্য ছাড়া কোনো সন্তানই মানুষের মতো মানুষ হতে পারবে না। এ েেত্র কোথাও তেমন অনাবিল আনন্দ নেই। তার মধ্যে বেশির ভাগ বিত্তশালীর বড় করুণ দশা। কার কথা বলব, গ্রামের মানুষ তারাও ভালো নেই। বিদেশে যারা চাকরি করছেন তারা কী যে অমানুষিক পরিশ্রম করে টাকা রোজগার করেন এটা যাদের জানা নেই, তাদের বোঝানো যাবে না। রক্ত পানি করা উপার্জিত টাকাও অনেকে বৈধ পথে পাঠাতে পারেন না, হুন্ডির মাধ্যমে পাঠাতে গিয়ে কত যে তিগ্রস্ত হতে হয় তা তোমাকে কী বলব? ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট এক নির্মম হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে তুমি চলে গেছো, আজো সে কথা মনে হলে বুক চৌচির খানখান হয়ে যায়; কিন্তু আবার যখন ভাবী দেশকে, দেশবাসীকে তুমি যতটা ভালোবাসতে তাতে দেশের আজকের অবস্থা দেখলে হয়তো তুমি সহ্য করতে পারতে না।
তোমার মৃত্যুর পর গীতশ্রী সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে সুধীন দাশগুপ্তের সুরে একসময়ের প্রখ্যাত সাংবাদিক বর্তমানে একজন বড়সড় শিল্পপতি আবিদুর রহমানের কথায় নির্বাসন জীবনে দু’টি গান আমায় বড় বেশি কাঁদাত।
১
বঙ্গবন্ধু, ফিরে এলে তোমার স্বপ্নের স্বাধীন বাংলায় তুমি আজ,
ঘরে ঘরে এত খুশি তাই;
কী ভালো তোমাকে বাসি আমরা বলো কী করে বোঝাই ॥
এ দেশকে বলো তুমি বলো কেন এত ভালোবাসলে?
সাত কোটি মানুষের হৃদয়ের এত কাছে কেন আসলে?
এমন আপন আজ বাংলার তুমি ছাড়া কেউ আর নাই ॥

সারাটা জীবন তুমি নিজে শুধু জেলে জেলে থাকলে;
আর তব স্বপ্নের সুখী এক বাংলার ছবি শুধু আঁকলে।
তোমার নিজের সুখসম্ভার কিছু আর দেখলে না তাই ॥
২
মিশে গেল কত নাম কত প্রাণ বাংলার মাটি আর ঘাসে,
মিশে গেল তারা হয়ে তারা সবে সোনার বাংলার এই সুনীল আকাশে ॥

বাংলার আলো আর বাতাসের দান বাংলার নদী আর পাখিদের গান
সব ঋণ শোধ করে গেল তারা শেষ নিঃশ্বাসে ॥

কত ভাই কত যে বোনের জীবনের বিনিময়ে গড়া হলো
স্বাধীন বাংলার এই পতাকা সেই সব নাম একদিন ধীরে ধীরে
পৃথিবীতে হয়তো বা পড়ে যাবে ঢাকা ॥

ঘূর্ণির ঝড়ে কত সাগরের ঢেউ উঠে মিশে যায় তার হিসাব কি কেউ
চিরকাল লিখে রাখে বলো কভু ইতিহাসে? ॥
গান দু’টি নিশ্চয়ই তুমি শোনোনি। হয়তো বা জনাব আবিদুর রহমান কোনো সময় এই অমূল্য গানের রেকর্ডটি তোমাকে দিয়েও থাকতে পারেন। গীতশ্রী সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের মাতাল করা গলা এবং সুর আমাকে সব সময় কাঁদাত। এখনো গ্রামোফোন কোম্পানি অব ইন্ডিয়া লিমিটেডের রেকর্ডটি যখনই শুনি কেমন জানি অন্য জগতে চলে যাই। আমি যেমন স্বস্তি ও শান্তিতে নেই, দেশবাসীও ভীষণ কষ্টে আছে। স্বাস্থ্যসেবার কথা শুনলে তুমি আবার দ্বিতীয়বার মারা যাবে। আমাদের দেশে চিকিৎসায় দুর্নীতি কত রকম এবং কী কী, এ নিয়ে পৃথিবীর যে কেউ থিসিস করতে পারে। সহজেই ডক্টরেট ডিগ্রি নিয়ে পণ্ডিত হয়ে যেতে পারে। হাসপাতালে যাবে সিট পাবে না। কিন্তু একে ওকে পয়সা দিলেই বেসুমার সিট। তিন দিন ডাক্তার আসে না। কিছু খরচ করো দেখবে শিয়রে যমদূতের মতো সব সময় ডাক্তার দাঁড়িয়ে, পয়সা হলে কোনো কিছুতে কোনো অভাব নেই। এ নিয়ে পরের পর্বে অবশ্যই লিখব।
অতি সম্প্রতি কত কী যে রঙ দেখছি। আগে দেখতাম প্রসিদ্ধ ধনীদের বাড়িঘরের মূল ফটকে লেখা থাকত ‘কুকুর হইতে সাবধান’। এই সে দিন তোমার কন্যার এক মন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘আপনারা পুলিশ হতে সাবধান থাকবেন।’ পিতা, এখন অবস্থাটা বোঝো? সভ্য সমাজে পুলিশের কাছে মানুষ আশ্রয় নিতে যাবে, সেই পুলিশ আজ যেন এক হিংস্র প্রাণী। যে কারণে মন্ত্রী বলেন পুলিশ থেকে দূরে থাকতে। আজ দেখো চেতনার স্তর কোথায় নেমে গেছে। সমগ্র পুলিশ বাহিনীকে কুকুর অথবা হিংস্র প্রাণীর অপবাদে অভিহিত করা হলো অথচ একজন পুলিশও কোনো উহ্ আহ্ করল না। আর কী-ই বা তারা করবে। প্রায় সবাই তো শাড়ি-চুড়ি পরা। আর ইদানীং তাদের কর্মকাণ্ড দেখলে লজ্জায় মরে যেতে ইচ্ছে হয়। কী রোগেই যে ধরেছেÑ মারামারি, কাটাকাটি ছাড়া তারা কিছুতেই সুস্থির থাকতে পারে না। পাবলিক মারে, সাংবাদিক মারে, কোর্ট আঙিনায় পুলিশ ক্যান্টিনে নিয়ে দিনদুপুরে মেয়েদের শ্লীলতাহানি করেÑ এসবের বড় বড় ছবি পত্রিকায় ছাপা হয়, ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় সব কিছুর এত জ্বলজ্বলে ঝকঝকে ছবি আসে যা দেখার মতো। মনে হয় তুমি কখনো দেখোনি। তোমার জমানায় ছিল সাদা-কালো ছবি। এখন সবই রঙিন। কুকর্মের রঙিন ছবি এত ঝকঝকে তকতকে হয় যা দেখলে বিস্মিত হতে হয়। তার পরও মহিলা মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পুলিশের ব্যবহার এখন আগের চেয়ে অনেক ভালো। আবার সংবাদ সম্মেলনে তার ভাঙা দাঁত দেখিয়ে উপমা দেন আগের সরকারের আমলে পুলিশের আঘাতে তার দাঁত ভেঙেছিল। আদৌ তার দাঁত ভেঙেছিল কি না জানি না। শুনেছি মন্ত্রী হওয়ার পর একবার বাথরুমে পড়ে গিয়ে মাজা ভেঙেছিলেন। হয়তো সে সময় দাঁতও ভাঙতে পারে। কিন্তু ওসব দেখানোর মানে কী? বিএনপির সরকারের আমলে কারো যদি দাঁত ভেঙে থাকে তাহলে আওয়ামী লীগের আমলে কি মাথা ফাটিয়ে শোধ নিতে হবে? তাহলে ছোটবেলায় পড়লাম কেন, ‘কুকুরের কাজ কুকুর করেছে, কামড় দিয়েছে পায়। তাই বলে কি কুকুরের পায়ে কামড় দেয়া মানুষের শোভা পায়।’ কবির এ উপদেশ থেকে আমরা কি কিছুই শিখব না, কিছুই শিা নেয়ার নেই? আমরা বড় অসহায় অবস্থায় আছি। আবার প্রার্থনা করি তুমি দোয়া করো, আশীর্বাদ করো। আমরা যেন এই অধঃগতির হাত থেকে পরিত্রাণ পেতে পারি।
তোমাকে ফরিদপুরের বোয়ালমারীর গণহত্যা দিবসের জনসভার কথা বলেছিলাম। শাহ আবু জাফর টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট মাঠে অসম্ভব গরমের মধ্যে হাসামদিয়া গণহত্যা দিবস উদ্যাপিত হয়। মোটামুটি সাধ্যমতো তারা অনুষ্ঠানটি পালন করার চেষ্টা করে। প্রায় সব দলের লোকেরা ছিলেন। শুধু বর্তমান তথাকথিত মুক্তিযোদ্ধা সংসদের লোকজনের অভাব ছিল। কেন যেন কোথাও গেলে সাধারণ মানুষ তোমার অতি প্রিয় নিকট মানুষ হিসেবে বড় ভালোবাসা দেখায়। এত বিব্রত হই কখনো সখনো তোমার পরেই আমাকে নিয়ে আলোচনা করায়। তোমার তুলনায় আমি কত ুদ্র। তার পরও অনেকে বড় বেশি বড় করে ভাবে। সে দিনের মিটিংয়েও এর ব্যতিক্রম হয়নি। অনেক লোক কথা বলেছে, বক্তৃতা করেছে। ৩৩ জন নিরপরাধ গ্রামবাসী স্মরণে আমার মতো একজন নাখান্দানকে দিয়ে একটি ভিত্তিপ্রস্তরের উদ্বোধন করিয়েছে। কিন্তু ইনস্টিটিউটের প্রিন্সিপাল লিয়াকত হোসেন লিটন যখন সেই স্মরণসভায় বারবার ‘পাক বাহিনী, পাক বাহিনী, পাক হানাদার বাহিনী’ বলে উল্লেখ করছিল তখন আমার নিজেকে নাপাক মুক্তিযোদ্ধা মনে হচ্ছিল। আমরা কি ধীরে ধীরে নির্বোধ হয়ে গেলাম। পাক আর নাপাকের অর্থ বুঝি না। ১৬ মে ১৯৭১ সালে হাসামদিয়ায় যতীন্দ্র মোহন সাহা, যজ্ঞেশ্বর সাহা, শ্যামসুন্দর সাহা, সুরেশ চন্দ্র পোদ্দার, নীল রতন সমাদ্দার, হরিপদ সাহা, মল্লিক চন্দ্র চক্রবর্তী, সূর্যকুমার দাশ, কমলকান্তি পাল, সচিন্দ্রনাথ সাহা, বিনোদ বিহারী সিংহ, সুবলচন্দ্র সাহা, শরৎচন্দ্র পোদ্দার, চিত্তরঞ্জন দাস, প্রফুল্ল রুদ্র, সম্ভুনাথ চন্দ, কালিপদ বালা, সুরেন বাড়ৈ, গণেশ মণ্ডল, পুলিন কর্মকার, যতীন কুণ্ডু, ধীরেন মণ্ডল, বসুদেব রাজবংশী, সুমন্ত রাজবংশী, গোপাল রাজবংশী, নবদ্বীপ রাজবংশী, শান্তিরাম মণ্ডল, সুখচাঁদ মণ্ডল, যতীন্দ্রনাথ সাহা, হরিহর সাহা (পুটে) জিন্নাহ্ আলী ব্যাপারী, জীবনকৃষ্ণ দে, নিরোদা বালা দে’কে গুলি করে এবং পুড়িয়ে নির্মমভাবে যারা হত্যা করেছে এবং অনেক মা-বোনের সম্মানহানি করেছে সেই হানাদার খুনি বাহিনীকে ঘটনার ৪০-৪১ বছর পরও স্মরণ করতে গিয়ে তাদের পাক পবিত্র বলছি। আমরা কি ভাষাজ্ঞান হারিয়ে ফেলছি। বড় অদ্ভুত লেগেছে!
আবু জাফর মিয়া নামে শাহ আবু জাফরের নেতা মঞ্চ কাঁপিয়ে এক বক্তৃতা দিলেন, সাথে তার পাইলদোহারী সাজলেন তথাকথিত এক মুক্তিযোদ্ধা আবির আহাদ। তাদের বক্তব্যের মূল সুর ছিল, ‘বঙ্গবন্ধু আপনাকে কত ভালোবাসতেন। বঙ্গবীর বলে ডাকতেন। আপনি আওয়ামী লীগ ছেড়ে যাবেন কেন? আপনাকে মাটি কামড়ে পড়ে থাকতে হবে। বঙ্গবন্ধুর কন্যা জননেত্রীকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে আপনার নেতৃত্ব নিতে হবে। আপনাকে আমাদের হাল ধরতে হবে।’ তাদের ভাবখানা এই, তোমার কন্যা যা কিছু করুক গোলামের মতো তার পায়ে পড়ে থাকলেই খুশি। তারা তো জানে না তোমার এই পুত্রের উচিত কথা বলতে পেটের ভেতর কুরকুর করে। শক্তি দিয়ে কাদের সিদ্দিকীকে বশ করা যায় না। পিতা, তুমি ছাড়া আর কেউ জানে না। আর আমি, তুমি সবাই তো আল্লাহর গোলাম। সেই আল্লাহকে বাদ দিয়ে গোলামের গোলামি করি কী করে? তাই ওই সভাতেই বলেছিলাম, ‘কোনো বাবার পাঁচ সন্তান হলে বড় হওয়ার পর আলাদা বাড়িঘর করলে অন্য ভাই-বোনেরা গিয়ে তার বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয় না। সম্ভব হলে তাকে সাহায্য করে। তোমার হুকুমে মুক্তিযুদ্ধ করে তোমার পদতলে লাধিক অস্ত্র দিয়েছি। জীবনে প্রায় ৪৫ বছর তোমার লালন-পালন করা আওয়ামী লীগের ঝাণ্ডা উঁচুতে থাকুক তার জন্য জীবনপাত করেছি। এখন তোমার কাছে আসার সময় গামছা মার্কা নিয়ে ছোট্ট একটা ঘর বেঁধেছি। সেই ঘর জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিতে কত যে কুচেষ্টা। সে সভায় খুব সাবলীল ভাষায় বক্তৃতা করেছিল তোমারই ফরিদপুরের এক মেয়ে এএইচ গ্র“পের চেয়ারম্যান সুরভী হোসেন চামেলি এবং তার স্বামী একই গ্র“পের এমডি আবুল হোসেন। ফেরার পথে তাদের জুট মিলে নিয়ে গিয়েছিল। কর্মকর্তা, কর্মচারী, শ্রমিকদের এক ছোট সমাবেশও করেছে। বড় ভালো লেগেছে তাদের আন্তরিকতায়। আমার এবং আমার স্ত্রী নাসরীনের জন্য মস্তবড় গাঁদা ফুলের মালা দিয়েছিল। যা ঘরে ফিরেই প্রিয়তমা পতœী নাসরীনের গলায় পরিয়ে দিয়েছিলাম। স্বাধীনতার পর থেকে আমি গলায় মালা পরি না। তাই আমারটা হাতে করে এনেছিলাম। আমার ছোট্ট কুশিমণি গলায় মালা পরে সারা বাড়ি মহানন্দে ছোটাছুটি করেছিল। মালা গলায় সে যখন হাঁটছিল মালাটি ফোরে গড়াগড়ি যাচ্ছিল। বড় স্বর্গীয় দৃশ্য দেখাচ্ছিল সেটা। শুধু ফুলমালা নয়। এএইচ গ্র“পের চেয়ারম্যান ও এমডি তাদের বাসায় নিয়ে নাশতা খাওয়াতে পীড়াপীড়ি করছিল। নানা ফলমূলের সাথে চিতই পিঠা ছিল। সাধারণত চিতই পিঠা গোল করে বানানো হয়। সেই প্রথম দেখলাম আগেকার দিনের কলা বিস্কিটের মতো লম্বা চিতই পিঠা। আমার স্ত্রী নাসরীন চিতই পিঠা খুবই পছন্দ করে। স্ত্রী-ছেলেমেয়ের জন্য কোনো জায়গা থেকে খাবার জিনিস নিয়ে আসতে আমার কোনো লাজ-শরম নেই। ছেলেবেলায় যেমন কোথাও কোনো ভালো কিছু খেলেই ছোট ভাই-বোন ও মায়ের জন্য নিয়ে আসতাম। এখনো সে অভ্যাস ছাড়তে পারিনি। কিছু ভালো লাগলেই তা বাড়িতে নিয়ে আসার চেষ্টা করি। সে দিনও নিয়ে এসেছিলাম। অন্য কিছু না হোক সেই চিতই পিঠা আমার স্ত্রীর খুব ভালো লেগেছিল। এএইচ গ্র“পের চেয়ারম্যান সুরভী হোসেন চামেলি আমাকে বড় ভাই হিসেবে ডেকেছে। আমিও তাকে ছোট বোনের মর্যাদা দিয়েছি। আল্লাহ তাদের দীর্ঘজীবী করুন। আমিন। (চলবে)

রবিবার, ২৭ মে, ২০১২

অকার্যকর সংসদ ও ওয়ান-ইলেভেনের ভূত



বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তম
চরম রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে এবারও বিরোধী দল ছাড়া সংসদের বাজেট অধিবেশন শুরু হলো। এমন নেতৃত্ব, কর্তৃত্ব ও গুরুত্বহীন সংসদ দুনিয়ায় আর কোথাও আছে কি-না আমরা কেউ জানি না। কেউ কেউ বলছেন, বিরোধী দলের সংসদে যাওয়া উচিত। দেশের সব কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু হলো সংসদ। কিন্তু বাস্তবে বর্তমান সংসদের মর্যাদা বা গুরুত্ব মোটেই তেমন নয়। সংসদের কোনো কথাই তেমন কেউ শোনে না, শোনার চেষ্টাও করে না। সবাই জানে কার কথা শুনতে হবে। তাই তারা তার কথাই শোনেন, আর কারও নয়। মনে হয়, এবারই অনেক বেশি সংসদ সদস্যকে কারাগারে রেখে অধিবেশন বসছে। আবার অদ্ভুতভাবে মাননীয় স্পিকার বলেছেন, ‘২০০ একর সংসদ ভবনের সীমার উপর তার কর্তৃত্ব।’ তাহলে মনে হয় তিনি সংসদ ভবনের স্পিকার! বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের নন, বাংলাদেশেরও নন? একজন সংসদ সদস্য শুধু সংসদ ভবনের সীমানার জনপ্রতিনিধি নন, সারা দেশের। আর মাননীয় স্পিকারও শুধু রাবার স্ট্যাম্প নন, তিনি অভিভাবক। তার সদস্য যারা গ্রেফতার হয়েছেন তাদের প্রতিও তার দায়দায়িত্ব আছে। ইচ্ছে করলেই এক্ষেত্রে নিজের দায়দায়িত্ব এড়াতে পারবেন না। মাননীয় স্পিকার বলেছেন, ‘জেলে আবদ্ধ সংসদ সদস্যদের সংসদে আসা না আসা বা আনা না আনার বিষয়ে তার কোনো দায়িত্ব নেই। ব্যাপারটা কোর্ট এবং সরকারের।’ এটা কোনো দায়িত্বশীল স্পিকারের কথা হলো না। কোনো সংসদ সদস্য তো সাজাপ্রাপ্ত নন? শুধু অভিযুক্ত। তারা যদি কেউ ইচ্ছে করেন সংসদে আসবেন, দুনিয়ার কোনো শক্তি নেই তাদের ঠেকায়। বাংলাদেশের সংবিধান ও কার্যপ্রণালী বিধিতে মাননীয় স্পিকারকে যে সুযোগ-সুবিধা ও ক্ষমতা দেয়া হয়েছে তাতে তার অবশ্যই উচিত ছিল কারাবন্দি সব মাননীয় সদস্যকে চিঠি দিয়ে জানানো তারা সংসদ অধিবেশনে আসতে চান কি-না। যদি তারা সম্মতি দিতেন বা আগ্রহ প্রকাশ করতেন তাহলে তাদের অধিবেশনে আনা ছাড়া মাননীয় স্পিকারের কোনো গত্যন্তর ছিল না। আরও একটু দায়িত্বশীল সাহসী স্পিকার হলে ক্ষতি কী? ৭ম সংসদে স্পিকার হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর সময় সংসদ চলাকালে কিশোরগঞ্জের মেজর (অব.) আক্তারুজ্জামানকে এক ম্যাজিস্ট্রেট গ্রেফতার করেছিলেন। তার স্ত্রীর পত্রের পরিপ্রেক্ষিতে মাননীয় স্পিকার সংসদে রুলিং দিয়েছিলেন, একজন থার্ডক্লাস ম্যাজিস্ট্রেটের এ অপতত্পরতা গণতন্ত্র এবং সংসদকে অবমাননার শামিল। সেই ম্যাজিস্ট্রেটকে নোটিশ করে আনা হয়েছিল এবং মাননীয় স্পিকারের রুমে এক ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকে করজোরে ক্ষমা প্রার্থনা করে সে যাত্রায় তিনি রক্ষা পেয়েছিলেন। এ-তো সংসদের রেকর্ডেই রয়েছে। সংসদ মর্যাদাশীল গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে পরিণত না হলে গণতন্ত্র মোটেই সুসংহত হবে না। তাই সংসদকে সংসদের মতো ভূমিকা পালন করতে হবে। কোনো রাবার স্ট্যাম্প হলে চলবে না। এমনটা দেশবাসী কেউ চায়ও না।
ইদানীং কেন যেন সবাই বড় বেশি নিজের স্বার্থ নিয়েই ব্যস্ত। স্বার্থসিদ্ধির ক্ষেত্রে এখন আর কেউ ন্যায়-অন্যায় বিবেচনায় আনে না। কি বললে বা করলে ক্ষণিকের লাভ হবে তাই নিয়ে সবাই ব্যস্ত। সার্বিক অর্থে সাধারণ মানুষ বড় অসহায়। তাদের পাশে দাঁড়াবার কেউ নেই। সাধারণ মানুষও যেন কেমন কাউকে ভরসা করা ভুলে গেছে। তারা কাউকে পাশে পেতে খুব একটা আগ্রহী নয়। সবাই দেখছে দেশ ভাল চলছে না। শুধু কষ্ট আর কষ্ট। কারও কোনো নিরাপত্তা নেই, মান-মর্যাদা নেই। তারপরও ‘রেল চলে ঝমাঝম—পা পিছলে আলুর দম’। সরকার বলছে খুব ভালো, বিরোধী দল বলছে খুব খারাপ। মানুষ দেখছে ভীষণ অসঙ্গতি। কম বেশি সব খানেই অশান্তি। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নেই। লক্ষ্য করার মতো তেমন অর্থনৈতিক সফলতা নেই। শেয়ারবাজার লুটপাট, ফটকাবাজ নানা কোম্পানি হাজার হাজার কোটি টাকা প্রতারণা করে মানুষকে দিনের পর দিন সর্বস্বান্ত করে চলেছে। ‘ডেসটিনি-২০০০’ বলে একটি সংস্থার ৩৭টি প্রতিষ্ঠানের ৩৪টির হিসাব জব্দ। রাজনৈতিক হানাহানি, কাটাকাটি তো লেগেই আছে। চর দখলের মতো সর্বত্র চলছে সবকিছু দখল। দুর্নীতিই যেন সুনীতি হিসেবে স্থান দখল করেছে। বিদেশি আগ্রাসন তো আছেই। ভূমিতে, আকাশে, বাতাসে সর্বত্র তার আলামত দেখা যাচ্ছে। আবার মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ক’দিন ধরে বলে চলেছেন, ‘ওয়ান-ইলেভেনের কুশীলবরা এখনও সক্রিয়। তারা তাদের প্রচেষ্টা অব্যাহতভাবে চালিয়ে যাচ্ছে।’ আলামত বেশি ভালো নয়। আমরা কেউ কেন যেন অনেক কিছুই তলিয়ে দেখছি না। দেশের রাজনীতি, সামাজিক মর্যাদা, অর্থনৈতিক গতি ওয়ান-ইলেভেনের কর্মকাণ্ডে একশ’ বছর পিছিয়ে গেছে। সামাজিকভাবে বহু মানুষ অযথা লাঞ্ছিত হয়েছে। সামরিক বাহিনী ক্ষমতায় এলে সাধারণত যেটা হয়, ১৯৫৮ সালে আয়ুব খান সামরিক শাসন জারি করে যেমনটা করেছিলেন আরব সাগর থেকে দুর্নীতিবাজদের ফেলে দেয়া টনকে টন সোনা নাকি উদ্ধার করেছিলেন। কত মানুষকে যে ফাটকে ভরে ছিলেন তার কোনো হিসাব-নিকাশ ছিল না। ’৫৮-এর অক্টোবরে জেনারেল ইসকান্দার মির্জা সংবিধান স্থগিত করে সামরিক শাসন জারি করেন। ২০ দিন যেতে না যেতেই তাকে লন্ডনের এক হোটেল ম্যানেজারের চাকরি দিয়ে জেনারেল আয়ুব খান সব ক্ষমতা করায়ত্ত করেন। বছর না ঘুরতেই যাদের কারাবন্দি করে ক্ষমতায় এসেছিলেন তাদের হাতে-পায়ে অনেক ফুলচন্দন মেখে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ভাগ-বাটোয়ারা করে ১০ বছর দুর্দান্ত প্রতাপে দেশ চালিয়ে ১৯৬৯ সালে পূর্ব পাকিস্তানের উত্তাল গণআন্দোলনের মধ্য দিয়ে সেনাপ্রধান মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খানের কাছে ক্ষমতাহারা হয়েছিলেন। ফিল্ড মার্শাল মোহাম্মদ আয়ুব খান ‘প্রভু নয় বন্ধু’ বইতে তার জামানার বিশদ বর্ণনা দিয়েছেন। বইটির নাম ‘Friends Not Masters’। আমরা বিরোধীরা বাংলা করেছিলাম ‘বন্ধু নয় প্রভু’। সাধারণত এমনই হয়। বিরোধীদের কাজ বিরোধীরা করে, সরকারের কাজ সরকার করে। রাষ্ট্রব্যবস্থা যতকাল থাকবে ততকাল এ দ্বন্দ্ব থাকবে। এটা কোন দোষের নয়। এটাই বাস্তবতা। সুস্থ গণতান্ত্রিক সমাজে সরকার এবং বিরোধী দলের প্রচার প্রোপাগাণ্ডা বিচারের মালিক জনগণ। কিন্তু আমার দেশের জনগণ ধীরে ধীরে সেই মালিকানাও হারিয়ে ফেলছে। আজ দেশের মানুষের যে দুরবস্থা এটা সত্যিকার অর্থে তুলে ধরার ক্ষমতা কেউ রাখে না। কারও কোনো স্বস্তি নেই, সুস্থিতি নেই। এক লাগামহীন পাগলা ঘোড়ার মতো অবস্থা। আপনি বেসরকারি কর্মচারী, বেতনের টাকায় ১৫ দিন চলবে না। আপনি ডাক্তার, ক্লিনিকে না বসলে বেতনের টাকায় বাসা ভাড়া দিতেই শেষ। খাওয়া-দাওয়া, ছেলেমেয়ের লেখাপড়া, কাপড়-চোপড়, চিকিত্সা—এসব কী দিয়ে চলবে? ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার, সরকারি বা বেসরকারি? উপরি না নিলে বেতনের টাকায় গাড়ির তেল খরচও হবে না। একেবারে গ্রামের স্কুলশিক্ষক থেকে শুরু করে সচিব পর্যন্ত অথবা যেকোনো কর্মচারী কর্মকর্তার নির্ধারিত বেতনে এখন আর মাস চলে না। নিয়ন্ত্রণহীন দ্রব্যমূল্যের কারণে সত্ আয় আর ব্যয়ের কোনো সঙ্গতি নেই। দেশবাসীকে একেবারে ধ্বংস করে ফেলা হচ্ছে। তার ওপর দায়িত্বজ্ঞানহীন প্রশাসনে একেবারেই কেমন যেন একটা উদ্ভট অবস্থা। এই ২০-৩০ বছর আগেও অনেকেই তার দায়িত্ব পালনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিল। সরকারি কাজকর্মকে পবিত্র দায়িত্ব বলে মনে করত। কিন্তু এখন আর সরকারি দায়িত্ব কারও কাছে কোনো পবিত্র কিছু নয়। আগে মানুষ ব্যক্তিগত আর সরকারি সম্পদের পার্থক্য করত। কিন্তু এখন যে যত ক্ষমতাবান সে সরকারি সম্পদ আর নিজের সম্পদের কোনো সীমারেখা টানে না। মনে করে সবই তার। ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রেও একই রকম। তা না হলে আজ ক’দিন ধরে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী লাগাতার বলছেন, ‘ওয়ান-ইলেভেনের কুশীলবরা ঘুমিয়ে নেই। তারা একইভাবে তত্পরতা চালিয়ে যাচ্ছে।’ সরকারি অন্য মুখপাত্ররাও একই কথা বলছে। এটা তারা কাকে বলছেন? যারা বিরোধীদের নামে মামলা দিয়ে ১০-১১ দিনের মধ্যে সব প্রধান প্রধান নেতাদের বিরুদ্ধে চার্জশিট দিতে পারেন তাদের? নাকি যারা ৩৯ দিনেও গুম হওয়া ইলিয়াস আলীকে খুঁজে বের করতে পারেন না তাদের? অথবা যারা ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সাগর-রুনির হত্যাকারীদের ধরে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাবার হুমকি দিয়েছিলেন তাদের? অথচ ১০০ দিন পেরিয়ে গেল এখনও কোনো কূল-কিনারা করতে পারলেন না। বাতাসে শোনা যায়, উচ্চ পর্যায়ের লোকজনের সম্পৃক্ততাই নাকি ওই ব্যর্থতার কারণ। তাহলে তারা এই সময় ওয়ান-ইলেভেনের কুশীলবদের তত্পরতায় গণতন্ত্র ব্যাহত হওয়ার অশুভ আশঙ্কা ব্যক্ত করেছেন কার উদ্দেশে এবং কেন? ওয়ান-ইলেভেনের কুশীলবদের অগণতান্ত্রিক তত্পরতা দেশবাসীর পছন্দ হয়নি বলেই তো মহাজোটকে অমন মহা বিজয়ী করেছিল। ক্ষমতায় বসে সাড়ে তিন বছরেও কেন ওইসব অগণতান্ত্রিক কর্মকাণ্ডের হোতাদের আইনের হাতে সৌপর্দ করা হলো না? মহাজোটের অধিকাংশ নেতাই তো ওয়ান-ইলেভেনে নির্যাতিত। জনাব আবদুল জলিল, শেখ সেলিম, মোহাম্মদ নাসিম, মহীউদ্দীন খান আলমগীর—এরা তো কম নির্যাতিত হননি। আবদুল জলিল এবং মোহাম্মদ নাসিম তো মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে এসেছেন। কই, তাদের অমন নির্যাতন অসম্মান যারা করেছিল তাদের কেশাগ্র স্পর্শ করা হলো? কেন হলো না? যেহেতু কোনো রকম ধরা-ছোঁয়া ছাড়াই খুব সহজে পার পেয়ে গেছে তাই তাদের সাহস কিছুটা বেড়ে গেলে দোষ দেবেন কাকে? বেঁচে থাকার জন্য কাজকর্ম তো করবেই, তাই তারা যদি হাত-পা ছোড়াছুড়ি করে তাহলে তাদের দোষ দেবেন কী করে? ওয়ান-ইলেভেনের সরকারপ্রধান ফখরুদ্দীন আহমদ বাঙালি জাতির সব মান-সম্মান ধুলায় মিলিয়ে দিয়ে পৃথিবীময় বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বক্তৃতা দিয়ে বেড়াচ্ছেন। নাটের গুরু মইন উ আহমেদ মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পরও কয়েক মাস সেনাপ্রধান ছিলেন। তার কেশাগ্রও স্পর্শ করা হয়নি। অবসর নেয়ার পরও ভদ্রলোককে কেউ কোনো কিছু জিজ্ঞেস করেননি। তাহলে অমন না হয়ে উপায় কি? ওয়ান-ইলেভেনের এক ইফতারিতে সেনাপ্রধানের দাওয়াতে সেনাকুঞ্জে গিয়েছিলাম। বেসামরিক মুক্তিযোদ্ধা বীর উত্তম হিসেবে আমিই ছিলাম। মেজর জেনারেল আবদুল মতিন এবং জেনারেল মইন উ আহমেদের মাঝে বসিয়ে ছিলেন। মাগরিবের নামাজ শেষে জেনারেল মইন উ আহমেদ খেদ ব্যক্ত করে আমাকে বলেছিলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যে মিলিটারিদের নিয়ে এত কিছু তারা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে প্রথম অস্ত্রধারণ করেছিল। সেই ২য় বেঙ্গল রেজিমেন্টের বিরুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কী সব জঘন্য কথাবার্তা বলছে। এটা একটা ষড়যন্ত্র। একে সহজে মেনে নেয়া হবে না।’ আমিও বলেছিলাম, ‘২য় বেঙ্গল রেজিমেন্টের যেমন বাংলাদেশের স্বাধীনতায় স্মরণীয় ভূমিকা রয়েছে, ঠিক তেমনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র -শিক্ষকদের তো তার চাইতে হাজারগুণ প্রশংসনীয় ভূমিকা রয়েছে। ছোট্ট একটি তুচ্ছ ঘটনায় সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকদের প্রতি যে নির্মম আচরণ করা হয়েছে তা কোনোমতেই ভাবীকালের ইতিহাস ভালো চোখে দেখবে না।’ বলেছিলাম, ‘ক্ষমতায় থাকলে ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় কাজ করে না। তাই অমন বলছেন। নিরাসক্তভাবে চিন্তা করলে দেখবেন ছাত্ররা আমাদের সন্তান। পিতা-মাতা হিসেবে তাদের প্রতি আমাদের কী করা উচিত ছিল। কীভাবে তাদের বুকে আগলে রাখতে হয়।’ হঠাত্ করে বিশ্ববিদ্যালয় ছুটি ঘোষণা করা হলে হল থেকে বেরিয়ে যাওয়া ছাত্রদের শাহবাগের আজিজ মার্কেটসহ অন্যান্য জায়গায় গরুর মতো জোড়ন দিয়ে কী নির্যাতনই না করা হয়েছে। রেলস্টেশন, বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে তারা গাড়িতে উঠতে পারেননি। যেখানেই পাওয়া গেছে সেখানেই অত্যাচার করা হয়েছে। কোনো রাষ্ট্র তার সন্তানদের প্রতি অমন নির্মম আচরণ কখনও করে না। যখন যেখানে অমন আচরণ করা হয়েছে, সেখানেই রাষ্ট্রযন্ত্র ভেঙে খান খান হয়ে গেছে। সে দিন রাষ্ট্রযন্ত্রের সেনাবাহিনীর সদস্যদের কী করা উচিত ছিল? উচিত ছিল হানাদার পাকিস্তানিদের মতো না করে আমাদের সন্তানদের নিরাপদে বাড়ি যাওয়ার ব্যবস্থা করা, তাহলে জরুরি অবস্থার কুশীলবদের প্রতি মানুষের ভালোবাসা বৃদ্ধি পেত। কী প্রয়োজন ছিল অবৈধ উচ্ছেদের নামে একেবারে গ্রামপর্যায়ে শত শত বছরের পুরনো হাট-বাজার ভেঙে চুরমার করে দিয়ে লাখ লাখ মানুষকে পথে বসানোর? প্রত্যন্ত অঞ্চলের সেই গরীব মানুষগুলো তো সরকারি কোনো কর্মকাণ্ডে প্রভাব ফেলেনি। তবে কেন তারা অমন ক্ষতিগ্রস্ত হলো? জরুরি অবস্থা জারি করে যাদের নামে দুর্নীতির অভিযোগ আনা হলো সেই প্রধান প্রধান অভিযুক্তরাই তো আজ রাষ্ট্র এবং সমাজের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে ঘুষ দেয়ার অভিযোগ যিনি এনেছিলেন সেই আজম জে চৌধুরীকে তো একদিনের জন্যও কেউ জিজ্ঞেস করেনি। কয়েক হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ এনে যাকে গ্রেফতার করতে হন্যে হয়ে ঘুরছিল সেই ওরিয়ন গ্রুপের ওবায়দুল করিম এখন রাস্তাঘাট, ব্যবসা-বাণিজ্যের সবকিছু তার করায়ত্ত। যে বসুন্ধরা গ্রুপের প্রধান আহমেদ আকবর সোবহানকে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগে আন্ডাবাচ্চাসহ গ্রেফতারের চেষ্টা করা হচ্ছিল, না পেয়ে তার গুলশানের বাড়িঘরে কাঁটা দেয়া হয়েছিল— তিনিই দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত থাকা অবস্থাতেই বাংলাদেশ অলিম্পিক এসোসিয়েশনকে দুই-আড়াইশ’ কোটি টাকা ভিক্ষে এবং খেলাধুলার জন্য দুটি মাঠের জমি ঘুষ নিয়ে ধোয়া তুলসীপাতা হয়ে গেছেন। মইন উ আহমেদ সংবাদ সম্মেলন করে তার সঙ্গে বেশ বড় বড় ছবি তুলেছিলেন। এসবের কোনো কিছুরই তো প্রতিকার হয়নি। প্রতিকার হয়নি ওয়ান-ইলেভেনের প্রধান নায়ক জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর। ওয়ান-ইলেভেনেও যেমন ছিলেন এখনও তেমন আছেন। রাস্তাঘাটে শোনা যায়, বেগম খালেদা জিয়া বা জিয়াউর রহমানের ছেলে তারেক রহমানের ওপর নিষ্ঠুর নির্যাতনের পুরস্কার হিসেবেই তিনি নাকি এখনও অস্ট্রেলিয়ার রাষ্ট্রদূত হিসেবে আছেন। এমনকি চাকরির মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও তা বৃদ্ধি করা হয়েছে। আরও হয়তো হবে। যদিও ব্রিগেডিয়ার বারী এবং মেজর জেনারেল আমীন আমেরিকায় লুকিয়ে লুকিয়ে হোটেলে কাজ করছেন। সর্বত্র এই যদি অবস্থা হয়, তাহলে ওয়ান-ইলেভেনের কুশিলবরা তো সদর্পে থাকবেই। মানুষ তাদের অন্যায় কাজের বিচার প্রত্যাশা করেছিল মহাজোট সরকারের কাছে। তা তারা পায়নি। এ কারণে মানুষ মহাজোটের ওপর খুবই হতাশ।

শনিবার, ২৬ মে, ২০১২

পিতাকে পুত্র

পিতাকে পুত্র


॥ বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরোত্তম ॥

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
৭
তুমি নাই প্রায় এক সপ্তাহ। কেমন যেন একেবারে খাঁচায় বন্দী। ছেলেবেলায় বাড়ি থেকে ছয়বার পালানো বাঁধনছাড়া মানুষ আমি। কিন্তু ওর আগে এক দিনও এভাবে কাটাইনি। ছেলেবেলায় বাড়ি থেকে পালালে বাবা ও বড় ভাইয়ের ভয়ে সতর্ক থাকতে হতো। কিন্তু তোমার মৃত্যুর পর পালিয়ে থাকা একেবারে অসহ্য। তাই বেরিয়ে পড়তে চেয়েছিলাম প্রতি মুহূর্তে। কিন্তু নানা কারণে হয়ে উঠছিল না। মাকে দেখার জন্য মন বড় ছটফট করছিল। তাই বেরিয়ে পড়ার মুহূর্তে; আজাদ-মুরাদকে নিয়ে মা এসেছিলেন। জীবনে কখনো মাকে দেখে অমন ব্যাকুল হয়ে কাঁদিনি। মাও কেঁদেছিলেন। কিন্তু তার চোখে পানি ছিল না। কিছুণ পর শান্ত হলে মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলেছিলেন, ‘বজ্র, আর ঘরে থাকিস না। বঙ্গবন্ধুর খুনিরা তোকে পেলে মেরে ফেলবে। ঘর থেকে নিয়ে তোকে মেরে ফেললে আমি শান্তিতে কাঁদতেও পারব না। তুই রাস্তায় গিয়ে জাতির পিতার হত্যার প্রতিবাদ করে যদি মারাও যাস তখন আমি প্রাণভরে কাঁদতে পারব। বলতে পারব আমার বজ্র বঙ্গবন্ধুর হত্যার প্রতিবাদ করে জীবন দিয়েছে।’ হে পিতা, তোমাকে আজ কী বলি। আমার কোনো শ্রম, ঘাম কাজে এলো না। আমার মায়ের কষ্টের কোনো মূল্য হলো না। কেমন যেন সব কিছু এলোমেলো হয়ে গেল। এখন নিমুরাদরা যা দাপাদাপি করছে তাতে সম্মানে বেঁচে থাকাই মুশকিল। গত ১৬ মে বোয়ালমারীতে মুক্তিযুদ্ধের সময়ের একটি গণহত্যার স্মরণসভায় গিয়েছিলাম। সেই ঘটনাটা জানাতে বড় ইচ্ছে করছে তাই ওটা আগে বলে নিই। ১৫ মে ফরিদপুর সার্কিট হাউজে রাত যাপনের কথা তো বলেছি। পরদিন বোয়ালমারী যাওয়ার পথে রাজবাড়ী মোড়ে বিএনপির নেতা সাবেক মন্ত্রী কামাল ইবনে ইউসুফের এক ঘনিষ্ঠ কর্মী খন্দকার চান্দের বাড়িতে সকালের নাশতা করেছি। নাশতার চেয়ে তাদের 
আন্তরিকতা ও আগ্রহ ছিল অনেক বেশি। কেন জানি না কোথাও গেলে লোকজন কম হয় না। আর খাওয়ার সময় তো এমনিতেই হিসাব থাকে না। আমরা ছিলাম ১২ জন। মনে হয় নাশতায় শরিক হয়েছিল তিন বারোং ছত্রিশ অথবা চার বারোং আটচল্লিশ জন। খন্দকার চান্দ বেশ হৃদয়বান মানুষ। যতœ করার জন্য পাগল হয়ে গিয়েছিল। তার স্ত্রী নার্গিস খন্দকার মাচ্চর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান। খুব ধীরস্থির শান্ত স্বভাবের মানুষ। নাশতা শেষে একটা চমৎকার গামছা উপহার দিয়ে আমার হৃদয় জয় করে ফেলেছে। গামছার বদলে লাখো কোটি টাকা দিলেও হয়তো অতটা আনন্দিত হতাম না। সেখান থেকে ৯টা কয়েক মিনিটে বোয়ালমারীর পথে রওনা হয়েছিলাম। মাঝে বেশ কয়েক জায়গায় মোটরসাইকেল আরোহীরা অপোয় ছিল। তাই বোয়ালমারী পৌঁছতে বেলা ১১টা বেজে গিয়েছিল। এখন সভা সমিতিতে যেতে মোটরসাইকেল এক মস্তবড় উপদ্রব। তোমার সময় এটা মোটেই ছিল না। স্বাধীনতা যুদ্ধের আগে পুরো টাঙ্গাইল জেলায় মোট ১০-১২টা মোটরসাইকেল ছিল। ’৭২ সালের ২৪ জানুয়ারি অস্ত্র জমা নেয়ার পথে তোমাকে নিয়ে যে মোটরসাইকেল শোভাযাত্রা করা হয়েছিল। যেখানে ৪০টা ভালো মোটরসাইকেল জোগাতে আমাদের ভীষণ পেরেশান হতে হয়েছিল। আজকাল বৃহত্তর ময়মনসিংহের অনেক জেলায় চার হাজার মোটরসাইকেল জোগাড় করতেও তেমন বেগ পেতে হবে না।
যাক আগের কথা আগে বলে নিই। বাংলাদেশের স্বাধীনতার সময় রাস্তাঘাট ছিল খুবই অনুন্নত। আগে আরিচা-শ্রীরামদি ঘাট বা দৌলতদিয়া পারাপার হতে সময় লাগত দুই-আড়াই ঘণ্টা। অন্য দিকে নগরবাড়ী-আরিচায় যেতে তিন-চার ঘণ্টা লেগে যেত। ’৭২ সালের এপ্রিল মাসের শেষ সপ্তাহে প্রায় ১০০ সহযাত্রী নিয়ে কলকাতা সফর থেকে প্রথম ফরিদপুর সার্কিট হাউজে এসেছিলাম। খুবই পুরনো ফরিদপুর সার্কিট হাউজ। ১০০ বছরের বেশি হবে বয়স। ফরিদপুর সার্কিট হাউজের মতো হাতেগোনা আর মাত্র কয়েকটা। আশপাশের ঘরগুলোর উচ্চতা কম হলেও মাঝের দু’টি রুমের ছাদের উচ্চতা ২০ ফুট। গত বছর আজমীরে গিয়ে মারোয়ারা প্যালেসে ছিলাম। তারও ফোর থেকে ছাদের উচ্চতা ২০ ফুট। ৫০০ থেকে সাড়ে ৬০০ স্কয়ার ফুটের বিশাল রুম। ফরিদপুর সার্কিট হাউজের রুম কিছুটা ছোট ১৮ বাই ১৮। আগে ছিল ছয়-সাত একর ফাঁকা জায়গার মধ্যে সার্কিট হাউজ। এখন দালানকোঠা করে ভরে ফেলা হয়েছে। ’৭২ সালের পরে বেশ কয়েকবার ফরিদপুর সার্কিট হাউজে রাত কাটিয়েছি। ’৭৩ বা ’৭৪ সালের ঘটনা। একদিন সার্কিট হাউজে গিয়ে দেখি রীবাহিনী ক্যাম্প করেছে। রীবাহিনী গঠনে কাদেরিয়া বাহিনীর বিশাল ভূমিকা ছিল। প্রায় ৯ থেকে সাড়ে ৯ হাজার কাদেরিয়া বাহিনীর সদস্য ছিল রীবাহিনীতে। আমি গেছি শুনে রীবাহিনীর পরিচালক সরোয়ার মোল্লা খুব আগ্রহ নিয়ে ছুটে এলেন। অনেক গল্পগুজব হলো। কেন এসেছেন জিজ্ঞেস করতেই বললেন, ‘আর বলবেন না, বড় বিপদে আছি। শেষ পর্যন্ত জেল খাটতে হয় কিনা আল্লাহ মাবুদ জানেন।’ জেল খাটবেন কেন? ‘আর বলবেন না। শহীদ সাহেবের আর আমার সিকিউরিটি তর্কাতর্কি করে বক্সিং প্র্যাকটিস করতে গিয়ে একজন মারা গেছে।’ বললাম, ‘চিন্তা করবেন না। ভালোভাবে তদন্ত করুন, প্রয়োজন হলে আমাকে বলবেন।’ ঢাকায় এসে আনোয়ারুল আলম শহীদের কাছে সব শুনে খবর দিলাম মূল বীর কাদেরিয়া বাহিনীর সদস্য ঘাটাইলের দুর্মুজ খাঁকে। পাঠক যারা ‘স্বাধীনতা ৭১’ পড়েছেন তারা অবশ্যই দুর্মুজ খাঁকে চিনতে পারবেন। মুক্তিযুদ্ধের শেষদিকে তার কমান্ডার বেনু ব্যক্তিগত শত্র“ মেরেছিল। সে জন্য তার মৃত্যুদণ্ড হয়েছিল। যুদ্ধ শেষে নিহতের আত্মীয়স্বজন মা করে দেয়ায় সে বেঁচে যায়। তার স্থান হয় রীবাহিনীতে। সে সব সময়ই ভীষণ সাহসী আনমনা স্বভাবের ছিল। রীবাহিনী গঠনের সময় থেকেই সে আনোয়ারুল আলম শহীদের নিরাপত্তা রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করত। মহাপরিচালক, পরিচালক, লিডার, ডেপুটি লিডার ও অন্যান্য পদবির কর্মকর্তা নিয়ে রীবাহিনী গঠিত হয়। মহাপরিচালক ছিলেন কর্নেল নুরুজ্জামান। পরিচালক ছিলেন তিনজনÑ আনোয়ারুল আলম শহীদ, মোল্লা গোলাম সরোয়ার ও মেজর হাসান। কবে কোন সময় আনোয়ারুল আলম শহীদ আর মোল্লা গোলাম সরোয়ার দু’জন ফরিদপুর গিয়েছিল অথবা কোনোভাবে একত্র হয়েছিল। সেখানে দুই পরিচালকের দুই দেহরীর মধ্যে তর্কবিতর্ক বাধে। গোলাম সরোয়ারের রী দুর্মুজ খাঁকে বলে, ‘তোরা কোনো যুদ্ধই করিসনি, শুধু শুধু ফুটানি করিস।’ দুর্মুজ খাঁ রেগে গিয়ে জবাব দেয়, ‘আমরা যত যুদ্ধ করেছি তোরা তত যুদ্ধের নামও শুনিসনি।’ নানা তর্কবিতর্কের মাঝে হঠাৎ কী করে কথা হয় ঠিক আছে তুই আমারে এক বক্সিং দে, আমি তোরে আরেক বক্সিং দেই। দেখা যাক কার কত জোর। তবে একা নয়, দুই ডাইরেক্টরের সামনে দু’জন দু’জনকে বক্সিং দেবে। দিন-তারিখ ঠিক করে তারা সার্কিট হাউজের সামনে এক বিকেলে বক্সিং যুদ্ধ অনুষ্ঠিত করে। সেও এক অভাবনীয় ব্যাপার। দুর্মুজ খাঁ বলে, সরোয়ার মোল্লার সিকিউরিটিকে তুই আগে মার, সে বলে না তুই আগে মার। দুর্মুজ খাঁ গর্ব করে বলে আমি মারলে তুই আর মারার সুযোগ পাবি না। কিন্তু সে কিছুতেই রাজি হয় না। দু’জন অনেক তর্কবিতর্ক করে। পরিচালকেরা এতে ধৈর্য হারিয়ে ফেলে। শেষ মুহূর্তে দুর্মুজ খাঁ গোলাম সরোয়ার মোল্লার দেহরীকে আঘাত করে। বুকের ওপর এমন জোরে ঘুষি মারে সে টাল সামলাতে না পেরে পড়ে যায়, আর উঠতে পারে না। হাসপাতালে নিতে নিতেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে। এ নিয়ে তারা খুব ঝামেলায় পড়ে। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে তারা মুক্তি পায়। সেখানকার আরেকটি ঘটনা। তখন দেশে খুব খাদ্য ঘাটতি চলছে। নানা দেশ থেকে আমদানি করা খাদ্য আমেরিকার কারসাজিতে আমাদের বন্দরে না ভিড়ে অন্যত্র ভিড়ছে। চিটাগাংয়ের কাছাকাছি আসা খাদ্য বোঝাই জাহাজগুলোকে অন্য বন্দরে পাঠিয়ে দিয়ে একটা অহেতুক খাদ্যসঙ্কট সৃষ্টি করা হয়েছিল। যেখানে চালের দাম ছিল বারো আনা থেকে এক টাকা সের। সেই চালের দাম উঠেছিল আড়াই-তিন টাকায়। চার দিকে ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। তাই ’৭৪-এর শেষে দেশবাসীর কাছে আহ্বান করেছিলে, এক ইঞ্চিও জমি পতিত যাতে না থাকে। সরকারি জমি যে আবাদ করবে ফসল সে পাবে। আরিচা ফেরির কারণে মাঝে মধ্যেই ফরিদপুর সার্কিট হাউজে থাকতাম। ফরিদপুর সার্কিট হাউজে এক বুড়ো পিয়ন ছিলেন। সার্কিট হাউজের পিয়নেরা সাধারণত যেমন হন তেমন ছিলেন। সরকারি অতিথিশালায় বড় বড় যারা ওঠেন, তারা তেমন মাটির দিকে তাকিয়ে চলেন না। এটা প্রায় সর্বেেত্রই একই রকম। ‘নিজের ধন পরকে দিয়ে দৈবগ্য মরে কেথা বয়ে’ আমার অবস্থাও সেই রকম। অনেক কাজই সরল বিশ্বাসে করেছি। কোনো ভূতভবিষ্যৎ চিন্তা করিনি। ’৬২-’৬৫ পর্যন্ত বাড়ি থেকে ছয়বার পালিয়েছি। বাড়ি পালানোর সময়গুলো বড় অনাদর, বড় কষ্টে কেটেছে। তাই গরিব মানুষ দেখলেই মায়া হতো। এখনো যেমনটা হয়। সার্কিট হাউজের পিয়নের ছেলে নাকি লেখাপড়া করত। বইয়ের টাকা, এসএসসি পরীার টাকা, আইএ পরীার টাকা বছর তিনেকে পাঁচ-ছয় হাজার নিয়েছে। এখন পাঁচ-ছয় হাজার টাকার তেমন মূল্য নেই। কিন্তু ’৭২-’৭৫ সালে পাঁচ-ছয় হাজার টাকা ছিল অনেক টাকা। তখন সোনার দাম ছিল দেড়-দুই শ’ টাকা ভরি। ফরিদপুর শহরের আশপাশে এক পাখি জমির দাম হয়তো হতো হাজার টাকা, যা এখন হয়তো কোটি টাকা হবে। যাক ওগুলো। ওগুলো আমার উদ্দেশ্য নয়। আমার উদ্দেশ্য ফরিদপুর সার্কিট হাউজের পিয়নের সার্কিট হাউজ আঙিনায় ধান চাষ। ওই ধান লাগানোর জন্যও টাকা দিয়েছিলাম। মাঝে একবার দেখেছি ধানগাছ বেশ বড় বড় হয়েছে। তারও মাস দেড়েক পর কোনো এক সভায় কুষ্টিয়া অথবা চুয়াডাঙ্গা গিয়েছিলাম। ফেরার পথে রাতে ফরিদপুর সার্কিট হাউজে উঠি। গাড়ি থেকে নামতেই সেই পিয়ন পায়ের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়েন। বাপের বয়সের মানুষ বড় বিব্রতবোধ করছিলাম। টেনে তুলে জিজ্ঞেস করতেই সন্তানহারা পিতার মতো কাঁদতে কাঁদতে আকুল হয়ে বলল, ‘আপনার টাকায় ধান বুনেছিলাম। সব ধান পেকেছে। একদিন ২৫-৩০ মণ কেটে বাড়িতেও নিয়েছি। এখন নাজির সাহেব বলছেন, আমি ধান নিতে পারব না। তিনি নিবেন। ধান মাড়ানো হলে সেখান থেকে অর্ধেক দেবেন। আমি এত কষ্ট করে ধান ফলালাম এখন নাজির সাহেব নিয়ে যাবে কোনো বিচার পাব না। আপনি একটা কিছু করেন।’ সে যে কী কান্না! না দেখলে কেউ বুঝতে পারবে না। রাতেই নাজিরকে ডাকলাম। সব নাজিররা যেমন হয় তিনিও তেমন ছিলেন। একজন নাজির সারা জীবন একই জায়গায় থাকেন। চাকরিটা ছোট হলেও মতা অনেক। অনেক ডিসিই জানেন না তার জেলায় কোথায় কী আছে কী নেই। কিন্তু নাজিরের সব নখদর্পণে। ডিসিরা চাইলে নাজিররা পারেন না এমন কোনো কাজ নেই। বলতে গেলে সিন্দুরে পোকার কলিজা অথবা বাতাসের ডগা এনে দিতে পারেন। নাজিরের চাকরি করতে হলে সবার আগে ‘জি হুজুর’, মানে পো ধরা শিখতে হয়। গরিব পিয়ন ধান বুনেছেন সেটা নিতে গেছেন কেন জিজ্ঞেস করলে বিনয়ের অবতার সেজে জবাব দিলেন ডিসি সাহেব বলেছেন, গরিব মানুষ ওর ধান তুলতে অসুবিধা হবে তাই সরকারিভাবে উঠিয়ে ওকে যেন অর্ধেক দিয়ে দেই। আমার এখানে কী করার আছে? সব ডিসি স্যারের হুকুম। পরদিন সকালেই চলে আসতে চেয়েছিলাম। বিষয়টা বোঝার জন্য একটু দেরি করে রওনা হব বলে ঠিক করলাম। ফোন করলাম ডিসি সাহেবকে। তিনি খুব অমায়িক ভদ্র মানুষ। বললেন, সকালে একসাথে নাশতা খান। যদি আমার বাড়িতে আসেন তাহলে খুব খুশি হব। জনাব মোহাম্মদ আলী ছিলেন তখন ফরিদপুরের ডিসি। ক’দিন পরই তিনি তোমার পিএস হয়েছিলেন। জনাব মোহাম্মদ আলীর আগে খুব সম্ভবত জনাব ফরাসউদ্দিন তোমার পিএস ছিলেন। লোক হিসেবে তিনি অসাধারণ। যেমন পণ্ডিত তেমনি ভালো মানুষ। এখনকার মতো হালকা নন। তখন যে পদে যার যতটুকু যোগ্যতা থাকা দরকার তার পুরোমাত্রাই ছিল। সকালে গোলাম মোহাম্মদ আলীর বাসায় নাশতা খেতে। মানুষটা দেখতে যেমন সুন্দর, ব্যবহারও ছিল অমায়িক। জিজ্ঞেস করলাম পিয়নের ধান নাজিরের নিয়ে যাওয়ার কথা। বললেন, হ্যাঁ, ব্যাপারটা শুনেছি। নাজির বলছিলেন, গরিব পিয়নটা অর্থাভাবে ধান কাটতে পারছেন না। তাই নাজির সরকারিভাবে ধান কেটে যতটা সম্ভব দিতে চেয়েছেন। তুমি এখন বোঝ। ডিসি আর নাজিরের কথায় পার্থক্য কোথায়? ডিসি সাহেবকে বললাম, এটা মোটেই ঠিক হচ্ছে না। সরকারি নীতিমালা অনুসারে সরকারি জায়গায় যে যা বুনবে সে ফসল সে ভোগ করবে। পিয়ন বুনেছেন পিয়নই ষোলো আনা পাবেন। জিজ্ঞেস করলাম, ‘সার্কিট হাউজের জায়গাটি কার?’ বললেন, ‘পূর্ত মন্ত্রণালয়ের। ডিসি তার জিম্মাদার।’ বললাম, ‘পিয়নের ধান পিয়নকে নিতে বলতে পারেন কি না।’ ভদ্রলোক বললেন, ‘আপনি বললে না করি কী করে। কিন্তু একবার বলে ফেলেছি। এখন অন্য রকম বললে সম্মান থাকে না।’ বললাম, ‘ঠিক আছে, পূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে যদি বলে।’ তিনি বললেন, ‘আমার দিক থেকে কোনো আপত্তি নেই। আর আমিও চাই পিয়নের ধান পিয়ন নিক।’ ‘ঠিক আছে।’ মাগুরার সোহরাব হোসেন তখন ছিলেন ত্রাণ পুনর্বাসন ও পূর্তমন্ত্রী। ডিসির বাড়ি থেকে ফোন করলাম। পেয়েও গেলাম সহজে। পূর্তমন্ত্রী সোহরাব হোসেন দেখতে খুবই কালো। মাগুরার সোহরাব হোসেন আর চট্টগ্রামের জহুর আহমেদ চৌধুরী দেখতে প্রায় একই রকম। গায়ের রঙ কালো হলেও মানুষ হিসেবে ছিলেন দিলখোলা। তাদের অন্তর ছিল ধবধবে সাদা। অমন পরিষ্কার হৃদয়ের মানুষ খুব একটা পাওয়া যায় না। স্বাধীনতার পর জাহাঙ্গীর স্মৃতি সেবাশ্রমের জন্য যখন যা চেয়েছি ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে দিয়েছেন। তালিকার কোনো জিনিস বাদ দেননি। এমনকি কখনো পরিমাণও কমাননি। কোনো একবার নাকি ডিজি রিলিফ কিছু কমিয়ে দিতে অনুরোধ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘কাদের সিদ্দিকীর লেখার ওপর কলম ধরব তা কী করে সম্ভব।’ কথাটা নিজে শুনিনি। ওটা আশপাশ থেকে শোনা। ’৭৩-এ সোহরাব হোসেনের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হয়েছিল। তাকে মন্ত্রিসভা থেকে বাদ দিতে নানা অভিযোগ আনা হয়েছিল। সেসব অভিযোগের ওপর ভিত্তি করে তুমি তিন সদস্যের এক তদন্ত কমিটি গঠন করেছিলে। কমিটির নেতা ছিলেন খাদ্যমন্ত্রী ফণী ভূষণ মজুমদার। যুবনেতা শেখ ফজলুল হক মনি ভাই এবং আবদুর রাজ্জাক ভাই। আমি এসবের কিছুই জানতাম না। হঠাৎ একদিন ডাক পেয়ে তার বাসায় যাই। তিনি সব কিছু খুলে বলেন, ‘ভাই, স্বাধীনতা যুদ্ধে সব কিছু হারিয়েছি। এখন দুর্নীতির অভিযোগে মন্ত্রিত্ব গেলে বেঁচে থাকার কোনো অর্থ থাকে? কয়েকজন নেতা ষড়যন্ত্র করে আমাকে শেষ করতে চায়। ফণীদার বাড়িতে মিটিং হচ্ছে। কালকের মধ্যেই মন্ত্রিত্ব যাবে। তোমার যদি কিছু করার থাকে করতে পারো।’ সোহরাব ভাইয়ের বাড়ি থেকে ফণীদার বাড়ি গিয়েছিলাম। কেউ কোনো বাধা দিলো না। আর তখন কেউ কোনো বাধা দিতও না। ফণীদার ঘরে গিয়ে দেখি মনি ভাই আর রাজ্জাক ভাই কথা বলছেন। ফণীদা জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী কাদের, তুমি এ সময়?’ বললাম, ‘সোহরাব ভাইয়ের বাড়ি গিয়েছিলাম তার নাকি মন্ত্রিত্ব যাচ্ছে।’ ফণীদা বললেন, ‘তাকে নিয়েই তো আলোচনা করছি।’ বললাম, ‘ভালো। দুর্নীতির অভিযোগে কাল সোহরাব ভাইয়ের মন্ত্রিত্ব গেলে পরশু দিন আরেকজনের যাবে, তারপর পুরো মন্ত্রিসভা নিয়েই টানাটানি হবে। সোহরাব ভাইয়ের গায়ের রঙ কালো হলেও ভেতরটা জ্বলজ্বলে উজ্জ্বল আলোকিত। একটু চিন্তাভাবনা করবেন।’ মনি ভাই ও রাজ্জাক ভাই আমাকে ভীষণ স্নেহ করতেন। মনি ভাই বললেন, ‘এই কাদের, তুই আবার এর মধ্যে জড়াতে গেলি কেন?’ বললাম, ‘জড়াতে যাইনি। সোহরাব ভাইয়ের সাথে বহু দিন ধরে জড়িয়েই আছি।’ রাজ্জাক ভাই উঠে এসে বললেন, ‘এই তুই কী করে সোহরাব ভাইয়ের প?ে’ বললাম, ‘আমি কোনো প-েবিপে না, সোহরাব ভাই ভালো মানুষ তাই বলতে এসেছিলাম।’ উঠে দাঁড়াতেই ফণীদা বললেন, ‘কাদের তুমি একটু নেতার কাছে যাও। এখানে যা বললে নেতাকেও তাই বলো গিয়ে। দেখো রাস্তা একটা বের হয়ে যাবে।’ আমার বাসার কাছেই গণভবনে তুমি থাকতে। সময়টা খেয়াল নেই। দেখেই বললে, ‘কী রে, কী মনে করে এসেছিস?’ বললাম, ‘সোহরাব ভাই ডেকে পাঠিয়েছিলেন। তার নাকি মন্ত্রিত্ব যায়। আমার চোখে সোহরাব ভাই খুবই ভালো মানুষ।’ তুমি বললে, ‘আরে ও দেখতে কালো হলে কী হবে ওর ভেতরটা বড় সাদা। কিছু মানুষ ওকে নিয়ে নানা কথা বলছে। তাই ফণীদাকে, মনি ও রাজ্জাককে তদন্ত করে রিপোর্ট দিতে বলেছি।’ বললাম, ‘মনি ভাই আর রাজ্জাক ভাই তো তার ঘোর বিরোধী।’ তুমি বলেছিলে, ‘আরে পাগল তা জানি।’ বলেছিলাম, ‘তা যদি জানো তদন্ত করতে দিলে কেন? কাল সোহরাব হোসেনের মন্ত্রিত্ব যাবে। পরশু আরেকজনের। তারপর তোমাকে ধরে টান দেবে।’ মাথায় হাত দিয়ে বলেছিলে, ‘আরে থাম, বুঝেছি।’ সাথে সাথে ফণীদা, শেখ ফজলুল হক মনি ও রাজ্জাক ভাইকে ডেকে পাঠিয়েছিলে। বলেছিলে, ‘আর তদন্ত-ফদন্ত করতে হবে না। লিখে দাও কোনো অভিযোগের ভিত্তি নেই।’ সোহরাব হোসেন কাহিনী সেখানেই শেষ। সেই সোহরাব ভাইকে ফরিদপুরের ডিসি মোহাম্মদ আলীর বাড়ি থেকে ফোন করে অনেক কষ্টে পেয়েছিলাম। সোহরাব ভাইকে সব খুলে বললে তিনি ডিসি মোহাম্মদ আলীকে তুনি সব ধান পিয়নকে দিয়ে দিতে বললেন। তোমাকেও ফোন করেছিলাম, সব কথা শুনে মোহাম্মদ আলীকে বলেছিলে, ‘কাদের সীমার বাইরে কথা বলে না। ওর কথা রা করার চেষ্টা করো।’ ফরিদপুর সার্কিট হাউজের পিয়ন কাহিনী ওখানেই শেষ। নাজিরের বাড়িতে নেয়া সব ধান ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছিলেন, যা ভারত-পাকিস্তান আমলে আর কখনো ঘটেনি। জেলার নাজিররাই সার্কিট হাউজের মালিক-মোক্তার। এনডিসি আর নাজির মিলে জেলা চালান। এনডিসি জুনিয়র অফিসার হন বলে অনেক েেত্র নাজিরদের এক দাঁতের বুদ্ধিও রাখেন না। নাজিররা খুব বুদ্ধিমান হন। তারা জানেন পানিতে বাস করে কুমিরের সাথে লড়াই করা কোনো বুদ্ধিমানের কাজ নয়। তাই তারা অমন করেনও না। ফরিদপুরের নাজিরও করেননি। এখন ফরিদপুর সার্কিট হাউজ আঙিনা নতুন নতুন নানা ইমারতে ভরে গেছে। ২৫-৩০টির বেশি রুম হবে। বিএনপির মন্ত্রী, জমিদার পরিবারের সন্তান চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফ নিশ্চয়ই সার্কিট হাউজ সম্প্রসারণে ভূমিকা রেখেছেন। পুরনো ভবনটি ভেঙে না ফেলায় বেশ ভালো লেগেছে। আর বিশেষ করে দু-তিন বছর পর ফরিদপুর গিয়ে সেই পুরনো ভবনে সিট পেয়ে খুব খুশি হয়েছিলাম। (চলবে) 

রবিবার, ২০ মে, ২০১২

কেন এত অসহিষ্ণুতা?



ব ঙ্গ বী র কা দে র সি দ্দি কী বী র উ ত্ত ম
প্রধান বিরোধী দল বা জোটের প্রথম সারির প্রায় সব নেতা ঠুনকো অজুহাতে এখন কারাগারে। যেমনটা পাকিস্তানের জমানায় আয়ুব খানের আমলে ঘটেছিল। শাসকের পীড়ন কোনোদিন জয়লাভ করেনি। এটা ইতিহাস। ইতিহাস খণ্ডনের ক্ষমতা আমাদের কারোরই নেই। আমরা ইতিহাস সৃষ্টি করতে পারি, কিন্তু ইতিহাস খণ্ডন করতে পারি না। গণতন্ত্রের মূল কথাই হচ্ছে পরমত-সহিষ্ণুতা। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিপক্ষের মান-সম্মান, নিরাপত্তার গ্যারান্টি দেয়া। প্রতিপক্ষ ও প্রতিদ্বন্দ্বীই যদি না থাকে তাহলে রাজনীতি থাকে কোথায়? ফাঁকা মাঠে গোল দেয়ায় কৃতিত্ব কোথায়? দুর্দান্ত প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে জয়ী হওয়ার আনন্দই আলাদা।
গণতান্ত্রিক সমাজ কারও একার নয়। সবার মতামত নিয়েই গণতন্ত্র। সভ্য সমাজে চরম শত্রুর সঙ্গেও ভদ্র আচরণ করতে হয়। এমনকি যুদ্ধক্ষেত্রে যুদ্ধরত অবস্থাতেও কোনো কারণে উভয় পক্ষের কথা বলার প্রয়োজন হলে তা ভদ্রতা ও শালীনতা বজায় রেখে করতে হয়। সব মিটিংই যে সফল হয়, তা নয়। কিন্তু আলোচনার কথা বলে একত্র হয়ে কেউ কাউকে হত্যা করে না। হ্যাঁ, নবাব আলীবর্দী খাঁ মারাঠা দস্যু বর্গি সর্দার ভাস্কর পণ্ডিতকে আলোচনার্থে ডেকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করেছিলেন। তাতে বাংলায় বর্গির হাঙ্গামা নির্মূল হয়েছিল। গ্রামবাংলার মায়েদের আর বলতে হয়নি, ‘শিশু ঘুমালো পাড়া জুড়ালো বর্গি এলো দেশে, বুলবুলিতে ধান খেয়েছে খাজনা দেব কিসে?’ কিন্তু কেন যেন গণতন্ত্রের এ যুগে সব অগণতান্ত্রিক মনোভাব মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। বিরোধী দলের ৩৩ নেতাকে গ্রেফতার করে জেলে পোরা হলো। এখন যারা সরকারে আছেন আল্লাহ না করুন তারা যদি সরকারে না থাকেন, যারা বাইরে আছেন তারা যদি সরকারে যান, তাহলে যে ৬৬ জনকে খোঁয়াড়ে ঢোকানো হবে না, তার কি কোনো নিশ্চয়তা আছে? এমন প্রতিহিংসা নিয়ে আর যাই হোক সুস্থ সমাজ চলে না। মানবতা থাকা চাই; সভ্যতা, শালীনতা থাকা চাই। ধীরে ধীরে রাজনীতির সম্মান ধ্বংস হয়েই গেছে। আজ রাজনীতি আর রাজনীতিবিদদের হাতে নেই। আজ রাজনীতি হয়েছে বিত্তের দাস। কিন্তু বিত্ত ছিল একদিন রাজনীতির দাস। এখন গোলাম মনিব হয়েছে, মনিব হয়েছে গোলামের চেয়েও অধম। তা না হলে ক’দিন আগে দেখলাম, এক বঙ্গসন্তানকে রাস্তায় ফেলে পুলিশ বুট দিয়ে তার গলা চেপে রেখেছে। তারও আগে বিরোধী দলের চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুককে যা-তা-ভাবে নাজেহাল করেছে। আবার ১৮ তারিখের এক পত্রিকার প্রথম পাতায় এক পুলিশ কর্মকর্তার দু’হাতে গলা চেপে ধরা দেখে হৃদয়-মন-অন্তরাত্মা শিউরে উঠেছে। এ কী করে সম্ভব? এ কী দেখছি? এ তো মাস্তানের কাজ, গুণ্ডা-জল্লাদের কাজ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কোনো সুশৃঙ্খল বাহিনীর এ কাজ হয় কী করে? গুণ্ডা-তস্করের কাজ যদি সংবিধানের শপথ নেয়া কোনো কর্মচারী-কর্মকর্তা করে, তাহলে দেশ থাকে কোথায়? বড় মর্মপীড়ায় ভুগছি আর অপেক্ষায় আছি—আমরা বাঙালিরা কবে শাড়ি-চুড়ি ভেঙে আবার মানুষ হব। এমন কাপুরুষোচিত আচরণ এর আগে কখনও দেখা যায়নি। এই যদি গণতন্ত্র হয়, আমরা সে গণতন্ত্র চাই না। আমরা মানুষের মর্যাদা চাই। কেউ ১৬ কোটি জনতার গলা টিপে ধরুক, এটা বরদাশ্ত করা যায় না। আর যদি একজন পুলিশ কর্মকর্তা-কর্মচারী কিছু শক্তি আছে বলেই মালিকের গলা টিপে ধরতে পারে, তাহলে শক্তিমান বিশ্ব গোটা দেশটার যে এভাবে গলা টিপে ধরবে না, বা ধরে নেই, তাই বা বলি কী করে? তা না হলে বুক ফুলিয়ে শ্বাস নিতে পারছি না কেন? সব সময় কেমন যেন বুকের ওপর একটা পাথরচাপা ভার অনুভব করি। এটা আমার কথা নয়, এটা রাস্তাঘাটে, আকাশে বাতাসের কথা।
বঙ্গবন্ধু একসময় বলেছিলেন, ‘চোরা না শুনে ধর্মের কাহিনী।’ শক্তিমানরা অনেক সময় শক্তিহীনদের কথায় গা করে না। কিন্তু যখন শক্তিহীনদের সম্মিলিত আওয়াজ বিসুবিয়াসের আকার নেয়, তখন কারও পক্ষেই তা সামাল দেয়া সম্ভব হয় না। গণতান্ত্রিক আচার-আচরণকে নির্বাসন দিয়ে পরিচালনা করা যায় না গণতান্ত্রিক দেশ ও গণতান্ত্রিক সমাজ। কৌশল ভালো, কিন্তু বড় বেশি কৌশল অপকৌশলের নামান্তর। সরকারকে যেমন সারাদেশের সরকার, সবার সরকারের মতো আচরণ করতে হয়, ঠিক তেমনই বিরোধী দলকেও দেশের কল্যাণ চিন্তা করে অগ্রসর হতে হয়। যারা হয় না বা হতে পারে না তারা সব সময়ই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ভবিষ্যতেও এর ব্যতিক্রম হবে না।
গত ১৮ মে শুক্রবার বিকল্পধারা বাংলাদেশ-এর অষ্টম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে গিয়েছিলাম। বড় ভালো লেগেছে তাদের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর সফলতা দেখে। অধ্যাপক এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী আমাদের ঘনিষ্ঠজন। তাঁর বাবা কফিল উদ্দিন চৌধুরী ১৯৭০-এ আওয়ামী লীগের এমএনএ ছিলেন। তাই বদরুদ্দোজা চৌধুরীর আগেই তাকে চিনতাম। দু-চারবার রাজনৈতিক প্রোগ্রামে আর্থিক সাহায্যও নিয়েছি। বদরুদ্দোজা চৌধুরী ডাক্তারি পাস করে প্রথম যৌবনে টাঙ্গাইলের মির্জাপুর কুমুদিনী হাসপাতালে চাকরি করতেন। মায়া আপা পড়তেন কুমুদিনী কলেজে। আমার শাশুড়ি নার্গিস হামিদ কোরায়শী ছিলেন কুমুদিনী কলেজের প্রিন্সিপাল। তাই তাদের বিয়েতে যথেষ্ট ভূমিকা রেখেছিলেন, যে কারণে তারা আমার শাশুড়িকে শেষ দিন পর্যন্ত মায়ের মতো দেখতেন। সে কারণে ওই পরিবারের সঙ্গে আমাদের একটা আত্মীয়তার বন্ধন রয়েছে। অন্যদিকে বিকল্পধারার মূলস্তম্ভ মেজর (অব.) আবদুল মান্নান একজন সফল ব্যবসায়ী হলেও তাকে আমি একজন বড় মাপের দেশপ্রেমিক হিসেবেই মনে করি। কতদিন তার কত অমূল্য সময় নষ্ট করেছি। কখনও কোনো উহ্আহ্ করেননি। বারবার চলে আসতে চাইলেও ছাড়তে চাননি। মনে হয়, আমার সঙ্গে সময় নষ্টই যেন তার বড় ব্যবসায়িক সাফল্য। বিএনপি সরকারের বস্ত্রমন্ত্রী থাকতে যেদিন প্রথম তার মন্ত্রণালয়ে গিয়েছিলাম, সেদিন সিরাজগঞ্জের ৫-৬ এমপির সঙ্গে কথা বলছিলেন। আমাকে দেখেই আলাদা ঘরে নিয়ে কথা বলেছিলেন। ছোট মানুষ, কাজও ছিল ছোট, সময় লাগেনি। কথা শেষে বেরিয়ে এলে এমপি সাহেবদের বলেছিলেন, ‘বাংলার বীর কাদের ভাই এসেছিলেন আমার কাছে। এ যে আমার কত গর্বের। দেশ ঠিকভাবে চললে, বঙ্গবন্ধু থাকলে কাদের ভাই মন্ত্রী থাকতেন, আমরা গর্ব করে তাকে দেখতে যেতাম। আজ আমি মন্ত্রী, তিনি এসেছেন। আপনাদের রেখে তার সঙ্গে কথা না বললে এটা হতো আমার জাতির সঙ্গে চরম বেয়াদবি। এ দুনিয়ায় আমরা যতক্ষণ বেঁচে আছি ততক্ষণ একজনের কাজে আরেকজনকে লাগতে হবে। বেহেশত-দোজখে আমাদের যেহেতু কিছুই করার থাকবে না, তাই আমরা কারও কোনো কাজে আসব না।’ তার সেদিনের সে কথা আজও আমাকে আলোড়িত করে। মাঝে মাঝে তার কাছে গেলেই আমার দলকে দু-চার লাখ টাকাপয়সা দিয়ে সহযোগিতা করেন। যেখানে লাগবে কোটি, সেখানে অনেকেই দেন লাখ—এটাই স্বাভাবিক। তবে এক বিশাল হৃদয়ের অসাধারণ মানুষ মেজর (অব.) আবদুল মান্নান। তাই তার বারবার আহ্বান ফেলতে পারিনি, সাড়া দিয়েছিলাম। বিকল্পধারা বাংলাদেশ-এর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠান আমাকে ভীষণভাবে আলোড়িত করেছে, এক নতুন চিন্তার খোরাক দিয়েছে। বিএনপি সরকারে থাকতে তাদের ব্যর্থতা, অদক্ষতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ-প্রতিরোধ করতে যেমন বিকল্পধারা বাংলাদেশ-এর জন্ম, তেমনই আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকতে আওয়ামী সরকারের অনেক কাজের সঙ্গে একমত হতে না পেরে আমরা কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ গঠন করেছিলাম। উভয় দল এক রকম অত্যাচারিত হয়েছে। যে মূল দল থেকে বিভক্ত হয়ে বিকল্পধারার জন্ম, সেই দল বিএনপির জাতীয় নেতারা অষ্টম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে উপস্থিত হয়ে তাদের জন্মের বাস্তবতা স্বীকার করে অভিনন্দন জানানোয় আমি ভীষণ আনন্দিত হয়েছি। একেই বলে রাজনীতি। রাজনীতিতে যে শেষ কথা নেই, এটাই হলো তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ। তাই আমরা আশা করে রইলাম কবে হবে সেই শুভদিন যেদিন আওয়ামী লীগকেও স্বীকার করতে হবে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের জন্ম ছিল সময়ের এক অবশ্যম্ভাবী বাস্তবতা। অন্যদিকে কল্যাণ পার্টির সভাপতি মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইব্রাহীম বীর প্রতীক অংশ নিয়েছিলেন। তিনি সব সময় চমত্কার বক্তৃতা করেন। খোলামেলা হৃদয় দিয়ে বলেন। এখনও বড়সড় শক্তিশালী রাজনৈতিক হুমকি না হওয়ায় তাদের ওয়ান-ইলেভেনের সময় জন্ম প্রসঙ্গে কেউ তেমন সমালোচনা করে না। কারণ মাঝারি গাছ নিয়ে কোনো অসুবিধা নেই। বড় হলে ঝড়ে ভাঙে, ছোট হলে ছাগলে খায়। ভদ্রলোক আমাকে অসম্ভব সম্মান করেন, যে কারণে আমিও তাকে ভালোবাসি। আর সব থেকে বড় কথা মুক্তিযুদ্ধে তার যথার্থই ভূমিকা রয়েছে। তিনি যখন বললেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে এককভাবে তেমন ভূমিকা রাখতে পারা যাবে না মনে করেই বিএনপির জোটে গেছেন। কেন যেন তখন আমার মনে হয়েছিল, তার যখন মনে হলো একা থেকে তেমন কিছু করা যাবে না বলে জোটবদ্ধ হওয়া দরকার, তখন সরকারেরও কি মনে হয়েছে জোটবদ্ধ সব দলের প্রধান নেতাকে অহেতুক গ্রেফতার করলেও তাকে বাইরে রাখা দরকার? সঙ্গে সঙ্গে এও মনে হয়েছে, ৮ বছর আগে যে সময় বিএনপির চরম সুদিন, তখন কী কারণে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব তার তিল তিল শ্রমে-ঘামে গড়ে তোলা সংগঠন থেকে বেরিয়ে এসে বিকল্পধারা বাংলাদেশ-এর জন্ম দিয়েছিলেন। একেই বোধ হয় বলে জগত্, একেই বলে যাওয়া-আসা। এটাই বাস্তবতা।
বিকল্পধারার আরেক সম্ভাবনাময় নেতা বদরুদ্দোজা চৌধুরীর একমাত্র ছেলে মাহী বি চৌধুরী টোনাকে নিয়ে অনেকেই স্বপ্ন দেখেন। আমার স্ত্রী তাকে কোলে নিয়েছে। ও খুব ছোট থাকতে বহুবার টাঙ্গাইলে গেছে। আমরা তাকে খুবই স্নেহ করি। মনপ্রাণ উজার করে চাই—সে সফল হোক, জাতিকে অমানিশার অন্ধকার থেকে বের করে আনার নেতৃত্ব দিক। তাই আমার বক্তৃতার একাংশে বলেছিলাম, মাহী বি চৌধুরী বর্তমান যুবসমাজের সম্ভাবনাময় নেতা। এক হাতে দুই মাছ ধরা যায় না। দেশ ও দেশবাসীর অঙ্গের ভূষণ যদি হতে চাও, তাহলে সব ধ্যান, জ্ঞান, সাধনা থাকতে হবে মানুষের ওপর। সার্বক্ষণিক রাজনীতিক হতে হবে। খণ্ডকালীন রাজনীতি করে উপনেতা পাতিনেতা হওয়া যায়, জাতির নেতা হওয়া যায় না। মাহী আমার সঙ্গে একমত হয়নি। না হওয়ারই কথা। কারণ চিন্তা-চেতনার দিক থেকে ডিজিটাল বাংলাদেশে ডিজিটাল চিন্তায় আমাদের পার্থক্য অনেক। তবুও তাকে বলে এসেছি, এটা-ওটা করে এ পর্যন্ত কেউ জাতীয় নেতা হয়নি, জাতীয় নেতাদের অনুসারী হয়েছে। জানি না আমার কথা ওর চিন্তায় নাড়া দেবে কিনা, কিন্তু আমি তার সফলতা কামনা করি। সর্বোপরি সভ্য দেশ ও সমাজ হিসেবে আমি সুশাসন চাই, গণতান্ত্রিক শাসন চাই। গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় সুস্থ রাজনৈতিক দল বিকাশ অন্যতম উপাদান। রাজনৈতিক দল যত সবল ও সফল হবে, দেশে গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক চর্চা তত নিরাপদ হবে। ছোট্ট চারাগাছকে যেমন সময়মত সার-পানি দিয়ে বড় করতে হয়, তেমনই রাজনীতিকে সবল স্বাস্থ্যের অধিকারী করতে হলে রাজনৈতিক দলকে সঠিকভাবে রাষ্ট্র এবং সমাজের লালনপালন করতে হয়। তাই রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে বারবার বাধা দিয়ে আর যাই হোক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বা সমাজ বিকাশ হয় না।
গত পর্বে মুক্তিযুদ্ধের সময়ের স্মৃতিময় ধানগড়া নিয়ে আলোকপাত করেছিলাম। অনেক পাঠক তার পরের কথা জানতে চেয়েছেন। তাই ওদিকটায় কাউকে অন্ধকারে রাখতে চাই না। গভীর রাতে যখন ছাতিহাটির পৈতৃক ভিটায় পৌঁছই, তখন বাড়ির চেহারা দেখে অবাক হয়ে যাই। অনেক ডাকাডাকির পর চাচা বেরিয়ে আসেন। বেরিয়েই তিনি বলেন, ‘ভাই-ভাবীরা তো এখানে নেই।’
—কেন? তারা কোথায় গেছেন?
—কয়েকদিন হলো তারা ধানগড়া চলে গেছেন। মা-বাবা, ভাই-বোনদের দেখতে মন বড় ছটফট করছিল। তাই আর কোনো প্রশ্ন না করে ধানগড়ার দিকে পা বাড়াই। ঘুটঘুটে অন্ধকার, চারদিকে ঝিঁঝি পোকার ডাক, আর মিটমিটে জোনাকির আলো। ওর আগে কোনোদিন ধানগড়া যাইনি। কিন্তু বাবা-মা যেখানে ছিলেন, সে বাড়ি খুঁজে পেতে কোনো কষ্ট হয়নি। গ্রামের প্রান্তঃসীমায় লোকজনের সঙ্গে দেখা হওয়ায় তারাই নিয়ে গিয়েছিল নাজির হোসেন নাদুর বাড়ি। রাত সাড়ে ১২টা-১টা হবে। আস্তে করে ‘মা, মা’ ডাক দিতেই দরজা খুলে গেল। মনে হয়, মায়েরা তাদের সন্তানের জন্য সব সময় হৃদয়ের দুয়ার খুলেই রাখেন। প্রায় ২০ দিন পর মা-বাবাকে পেয়ে কেমন যেন হয়ে গিয়েছিলাম। খুব একটা সময় লাগেনি, সব ভাই-বোন ঘুম থেকে লাফিয়ে উঠে বানরের বাচ্চার মতো চারদিক থেকে জড়িয়ে ধরেছিল। ছোটবেলায় ভাই-বোনেরা আমাকে বড় বেশি জড়াজড়ি করে থাকত। কেন যেন আমি ছিলাম ওদের বড় কাছের মানুষ। মনে হয়, মা সব সময় আমার জন্য খাবার রেখে দিতেন। মুক্তিযুদ্ধের অত কঠিন সময়েও সব বাচ্চাকাচ্চাদের বাবা-মা আগলে ছিলেন। একমাত্র বড় ছেলে লতিফ সিদ্দিকী এমপি আর আমি তাদের পাখনার বাইরে। দশ মিনিটও লাগেনি আমাদের খাবার দিতে। আমরা গেলে নাজির হোসেনের বাড়ির সবাই জেগে উঠেছিল। এই সেদিন নাজির হোসেনের স্ত্রী বেগম হাফছা খাতুন যে মারা গেলেন, তিনি সবার আগে ছুটে এসে জড়িয়ে ধরে খুব কেঁদেছিলেন। খাবার খেয়ে মা-বাবার পাশেই শুয়ে পড়েছিলাম। পরদিন সকালে দেখলাম ধানগড়া গ্রাম। বংশাই নদীর পাড়ে হতদরিদ্র ছোট্ট একটি তন্তুবায়ী পল্লী। তারা সবাই কারিগর। কাপড় বুনে রুটি-রুজি নির্বাহ করে। কোনো রাস্তাঘাট নেই। গ্রামের মানুষ খুব একটা বাইরে যায় না, বাইরের মানুষও তেমন আসে না। একেবারে নিরিবিলি কোলাহলহীন ছোট্ট একটি গ্রাম। সকালে নাস্তা খেয়ে মা-বাবাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তোমরা এখানে কেন? কীভাবে এলে?’ তখনই শুনলাম পৃথিবীর এক নির্মম দুর্ভাগ্যের কাহিনী।